কেবলই অনিশ্চয়তার বাতাবরণ

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২১, ২২:২০

যাহা এই করোনাকালের এক বত্সরে অধিক সময় ধরিয়া হয় নাই, তাহাই হইয়াছে গত দুই দিনে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা গত দুই দিনে ৫ হাজারের উপরে হইয়াছে। ইহার পূর্বে গত বত্সরের ২ জুলাই করোনার সর্বোচ্চ সংক্রমণের ঘটনা ঘটিয়াছিল। করোনা সংক্রমণের সেই শীর্ষসংখ্যাটি ছিল ৪ হাজার ১৯। সুতরাং করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গ যে অধিক উঁচুতে উঠিবে, তাহা গত দুই সপ্তাহে আরো স্পষ্ট হইয়াছে বলিয়া মনে করিতেছেন অনেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

করোনা লইয়া আমরা অধিক লিখিতে চাহি না। করোনা মানুষের মধ্যে তীব্র আশাহীনতা তৈরি করে, কাজের সুযোগ ও পরিবেশকে সংকুচিত করে, অর্থনীতির শরীরে জোঁকের মতো জোর করিয়া লাগিয়া থাকিয়া রক্ত শোষণ করে। সুতরাং এক অর্থে করোনা একটি তীব্র হতাশার নাম। এই হতাশা আমরা চাহি বা না-চাহি, আমাদের অলিন্দে প্রবেশ করিয়াছে। যেই হেতু অন্ধ থাকিলে প্রলয় বন্ধ থাকে না, সুতরাং সমস্যাকে আড়াল না করিয়া উহা মোকাবিলা করাটাই দস্তুর। দেশে করোনা সংক্রমণকে মোকাবিলা করিতে সরকার সম্প্রতি নূতন করিয়া ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়াছে। নূতন প্রজ্ঞাপনে বিদেশফেরত লোকজনের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক করিবার পাশাপাশি জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সকল অফিস ও কারখানা অর্ধেক জনবল দ্বারা পরিচালনা, উপাসনালয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানা, জনসমাগম সীমিত করা, মাস্ক পরা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখা, অপ্রয়োজনে রাত ১০টার পর ঘর হইতে বাহির না হওয়া প্রভৃতি নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে। এই সকল সিদ্ধান্ত আগামী দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সমগ্র দেশে কার্যকর থাকিবার কথা জানা গিয়াছে। আমরা দেখিয়াছি, দেশে করোনার সংক্রমণ চূড়ায় উঠিয়াছিল গত বত্সরের জুন-জুলাই মাসে। ঐ সময়ে, বিশেষ করিয়া জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ হইতে জুলাই মাসের মাঝামাঝি অবধি প্রতিদিন গড়ে ৩-৪ হাজার রোগী শনাক্ত হইত; কিন্তু গত কয়েক দিনে আক্রান্তের আলামত নূতন অশনিসংকেত হইয়া দেখা দিয়াছে। পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যায়, তাহা হইলে নূতন করিয়া লকডাউন কিংবা এই জাতীয় কঠিন নির্দেশনা আসিতে পারে। তাহা যাহাতে দিতে না হয়, অর্থাত্ করোনার সংক্রমণের লাগাম যাহাতে টানিয়া ধরা যায়, তাহার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন করোনাকে অবহেলা না করা। নূতন বত্সরের প্রথম হইতে মনে হইতেছিল, করোনার বুঝি বিদায়ঘণ্টা বাজিল; কিন্তু মার্চের মাঝামাঝিতে আসিয়া করোনা নূতন ভেলকি দেখাইতেছে। করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গত ২৭ জানুয়ারি হইতে দেশে টিকাদান কর্মসূচি চালু হইয়াছে বটে, তবে দেশের ৭০ বা ৮০ শতাংশ মানুষকে করোনার ভ্যাকসিন না দেওয়া অবধি উহার সামগ্রিক সাফল্য আসিবে না। আর টিকাদানের গতির হিসাব অনুযায়ী ২০২২ সালের পূর্বে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করিবার কোনো সম্ভাবনা নাই। অন্যদিকে করোনার টিকা নূতন করিয়া দুর্লভ হইবার আশঙ্কা তৈরি হইয়াছে। অর্থাত্ চারিদিকে কেবল অনিশ্চয়তার বাতাবরণ দেখা যাইতেছে। একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম হইতে জানা গিয়াছে, গত ডিসেম্বর হইতে ব্রিটেনে করোনার নূতন যেই স্ট্রেইনটি আতঙ্ক তৈরি করিয়াছে, নূতন গবেষণায় বলা হইতেছে, উহার মারণক্ষমতা তেমন না হইলেও ভাইরাস দ্রুত ছড়াইয়া পড়িতে পারে মানুষের মধ্যে। সেই কারণেও বিশ্বের বর্তমানে লাফাইয়া লাফাইয়া বাড়িতেছে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের করোনা প্রজাতিতে আক্রান্ত রোগীদের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে। সুতরাং আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মানিতেই হইবে।

ইতিমধ্যে গণপরিবহনগুলি ধারণক্ষমতার অর্ধেকের বেশি যাত্রী পরিবহন করিতে পারিবে না বলিয়া উহার বর্তমান ভাড়া ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হইয়াছে। তবে ভাড়াও বৃদ্ধি হইল আবার যাত্রীও পূর্ণমাত্রায় বহন করা হইল—এমনটা যেন না ঘটে। অন্যদিকে হোটেল-রেস্তোরাঁয় ধারণক্ষমতার অর্ধেকের অধিক মানুষ প্রবেশ না করিবার বিষয়টি কী করিয়া নিশ্চিত করা যাইবে, তাহা আমরা জানি না। এই সকল নির্দেশনা মানিবার জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হইল সচেতনতা সৃষ্টি।