প্রথমবার ঢাকায় এসেছিলাম ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। বন্ধু, কবি ও প্রকৌশলী শিবলী সাদিকের সঙ্গে প্রথম ঢাকায় এসেছিলাম। সেবারই প্রথম অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আমার ভ্রমণ। সে অভিজ্ঞতা ছিল যেন একটি শিশুর ভাষা শেখার কাল, কৌতূহলে ভরা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। যা দেখি তা-ই ভালো লাগে! সে বছর বইমেলায় আমিও যেমন ছিলাম অচেনা এক তরুণ, তেমনি বইমেলাও আমার কাছে ছিল অদেখা, অচেনা এক অপরূপ আয়োজন। পরিচিত মুখ নেই বললেই চলে। কবি নির্মলেন্দু গুণ, হুমায়ূন আজাদ—খবরের কাগজে দেখা এরকম দু-একটি পরিচিত মুখ ব্যতীত সবই ছিল অচেনা।
তারপর ১৯৯৬ সালে বরিশাল থেকে লঞ্চযোগে দ্বিতীয়বার ঢাকায় আসি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ইয়ারের কোনো বন্ধুকে খুঁজে তার হলে রাত্রি নিবাসের ব্যবস্থা করেই মেলায় প্রবেশ করতাম। তারপর ফড়িং হয়ে বইমেলায় ঘুরে বেড়িয়েছি। সে এমন এক বয়স—দুই দিন অন্ন না হলেও শরীরের এমন কোনো ক্ষতি ছিল না। সে বছর আমাদের কেউ ঝর্ণা, কেউ চূড়াপ্রার্থী মন। ইতিমধ্যে কেউ কেউ বন্ধু হয়ে গেল। তখন আর শহরটাকে, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণকে পর মনে হতো না। আমরা কতিপয় তরুণ বর্ধমান হাউজের সামনে সবুজ ঘাসে বসতাম। দু-এক জন প্রথিতযশা কবি ও কথাসাহিত্যিকের সঙ্গে পরিচয় হতো। আমাদের চোখ-মুখ-নাক-কান-গলা আন্দোলিত হতো। যার লেখা প্রত্যন্ত গ্রামের বসে খবরের কাগজের সাময়িকীতে পড়েছি, তাকে স্বচক্ষে অবলোকনের আনন্দ চেপে রাখতাম বটে; কিন্তু মুখায়বে সেসবের প্রকাশ কেউ চেপে রাখতে পারতাম না। যেমন চাপা থাকত বুকপকেটে অপ্রকাশিত কবিতা! তখন একটি কবিতা ছাপা মানে কবি হয়ে যাওয়া। আজকের মতো নয়। অজস অখাদ্য ছাপা হচ্ছে দিস্তায় দিস্তায়!
এই তো চোখের সামনে অচেনা কয়েক জন তরুণীর সঙ্গে সেলিম আল দীন চলে গেলেন হঠাত্ হাওয়ার মতো। ঐ যে রফিক আজাদ কাঁধে ব্যাগ নিয়ে নির্লিপ্ত পৃথিবীর মতো আসছেন। পেছনে দু-তিন জন তরুণকে নিয়ে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছেন কবি আসাদ চৌধুরী! ভ্রুক্ষেপহীন নিঃশব্দে প্রবেশ করলেন সৈয়দ হক। হাসিমুখ নিয়ে এলেন ছড়াকার লুত্ফর রহমান রিটন। এরকম একটার পর একটা বিস্ময় নিয়ে বসতাম গিয়ে বহেরাগাছের নিচে।
