আত্মসংযমের মাস রমজান আসিতে খুব বেশি দেরি নাই। রমজান আত্মশুদ্ধি, নৈতিক প্রশিক্ষণ ও আত্মগঠনের মাস হইলেও প্রতি বত্সর রমজান আগমনের পূর্বেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। অতীতেও আমরা এমন কোনো রেকর্ড দেখিতে পাই না, যেই বত্সর রমজান উপলক্ষ্যে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায় নাই। রমজান ও নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি যেন সমার্থক হইয়া দাঁড়াইয়াছে। প্রতি বত্সরের ন্যায় এই বত্সরেও রমজান আগমনের পূর্বেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার অস্থিতিশীল হইয়া উঠিয়াছে। পাশাপাশি করোনার নতুন করিয়া সংক্রমণের প্রভাবে সরকার যখন নতুন করিয়া কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের চিন্তাভাবনা করিতেছে, সেই মুহূর্তে বাজারে পণ্যমূল্য লাগামহীন হইলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, নিম্নবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষ তথা সামগ্রিকভাবে সাধারণ মানুষকে নিঃসন্দেহে নিদারুণ দুর্ভোগ পোহাইতে হইবে।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকার কর্তৃক শতভাগ বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না হইলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে সহায়ক ভূমিকা পালন করিতে হয়। বাজারে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখিবার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে মনিটরিং সেল, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ইত্যাদি সংস্থাকে দায়িত্ব প্রদান করিয়া থাকে। ইহার মধ্যে টিসিবি প্রায় সারা বত্সরই বাজার স্থিতিশীল রাখিতে ভ্রাম্যমাণ ট্রাক কিংবা গাড়িতে করিয়া সরকারের নির্ধারিত মূল্যে সাধারণ মানুষের নিকট নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রয় করিয়া থাকে। রমজান উপলক্ষ্যে যখন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করিয়া বাজার অস্থির করিয়া তোলে, সেই সময় টিসিবির কার্যক্রম সাধারণ মানুষের মনে খানিকটা হইলেও স্বস্তি আনিয়া দিতে পারে। যদিও বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবি কার্যক্রম শতভাগ সফল নয়, টিসিবির কার্যক্রম লইয়াও বিভিন্ন সময় অভিযোগ পাওয়া যায়। দক্ষ জনবলের অভাব, অপর্যাপ্ত সরবরাহ, মূলধনের অভাবসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রহিয়াছে টিসিবির। পণ্য কেনায় পর্যাপ্ত তহবিল এবং সরাসরি পণ্য আমদানি ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে আইনি বাধার কারণে কার্যক্রমে গতিশীলতা হারাইতেছে প্রতিষ্ঠানটি। ইতিপূর্বে দেশের প্রধান নির্বাহী টিসিবিকে আরো গতিশীল করিবার নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন। সেই অনুযায়ী টিসিবিকে শক্তিশালী করিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গঠিত উপকমিটি ইহাকে সরকারি ক্রয়নীতির আওতামুক্ত রাখা, অগ্রিম আয়কর ও ভ্যাটমুক্ত রাখাসহ নতুন গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ, বহুতল ভবন নির্মাণ ইত্যাদি সুপারিশ করিয়াছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে টিসিবির নিজস্ব মূলধন থাকাও আবশ্যক। ইহার ফলে টিসিবি স্বাধীনভাবে পণ্য ক্রয় ও ভোক্তা পর্যায়ে বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করিতে সক্ষম হইবে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আপত্কালীন মজুত গড়িয়া তুলিয়া প্রয়োজনীয় সময়ে ভোক্তাসাধারণের নিকট সরবরাহ করিবার মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখিতে টিসিবির ভূমিকা অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদা ও জোগানের অজুহাতকে পুঁজি করিয়া যাহাতে অসাধু চক্র অযৌক্তিকভাবে পণ্য সরবরাহের ঘাটতি ও মূল্য বৃদ্ধি করিতে না পারে, সেই লক্ষ্যে সরকার টিসিবির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করিয়া থাকে। সেই কারণে রমজানের পূর্বে যখন বাজার অস্থিতিশীল হইয়া উঠে তখন বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবিকে কার্যকর ভূমিকা পালন করিতে হইবে। টিসিবির মাধ্যমে বিক্রীত পণ্যের সঠিক মূল্য এবং স্বচ্ছতার বিষয়টিও নিশ্চিত করা আবশ্যক। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসাবে টিসিবির সক্ষমতা বৃদ্ধি করার কোনো বিকল্প নাই।
