মুখ ও মুখোশ

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২১, ২১:৩৩

করোনা মহামারির কারণে মানুষের মুখে নতুন অলংকার জুটেছে। এর নাম হচ্ছে মাস্ক। কেউ কেউ বাংলায় বলেন মুখোশ। পণ্ডিতদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য ‘মুখের নিরাপত্তা আবরণী’ বলার চেষ্টা করেছেন। যদিও সেটা বাজার পায়নি। মাস্ক আসলে সেই জিনিস, যা দিয়ে মুখ ঢাকা যায়। মানে মুখোশ। করোনা মোকাবিলায় এই মাস্ক এখন নাক থেকে মুখ অবধি ঢাকা! রাস্তাঘাটে এখন বহুসংখ্যক মুখই যেন একই রকম। চেনাজানা মানুষকেও এখন চেনা দায়!

মাঝে কিছু দিন বিরতির পর করোনায় আবার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু। তাতে অবশ্য আতঙ্কও বাড়ছে। মুখোশ ব্যবহারের পরিমাণও অনেকটাই বেড়েছে। যানজটের নগরী খ্যাত ঢাকা এখন মুখোশের শহরে পরিণত হয়েছে। পাড়া-মহল্লার অলিগলি থেকে শুরু করে রাজপথ, ভিখারি থেকে কোটিপতি প্রায় সবার মুখে মুখোশ। রিকশা, ঠেলাগাড়ি, ভ্যানগাড়ি, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের আরোহী ও চালক কমবেশি সবাই মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মহামারির প্রকোপে আমাদের মুখ এখন মুখোশাবৃত। মুখমণ্ডলের কোন অংশ কতটা ঢাকব এবং কীভাবে ঢাকব, তা নিয়ে চলছে নানাবিধ তত্পরতা, নানা জনের নানা মত। আত্মরক্ষার বাসনা যত প্রবল হচ্ছে, মুখের ওপর মুখোশও তত বেশি পরিমাণে উঠছে। সাবধানিরা একটি মুখোশে আস্থা পাচ্ছেন না, তাই দুইটি মুখোশ ব্যবহার করছেন। মুখে প্রাচীন যোদ্ধাদের মতো অনেকে আবার হেডশিল্ড ব্যবহার করছেন।

আসলে ব্যাধি বড় বালাই! তার ওপর করোনার মতো বহুরূপী সংক্রামক ব্যাধি হলে ভয় পেতেই হবে। মাস্কবিহীন বীরত্ব নিজের পক্ষে ও সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর। এই ব্যাধি তো একার নয়, সাবধানতা অবলম্বন না করলে অন্যদেরও ছোঁয়াচ লাগবে। তাই সবখানে চলছে মুখোশের জয়গান, মুখোশ পরার জন্য আবেদন-নিবেদন। পথচারী ও বাহনচালকদের বিনা মাস্কে জরিমানা ছাড়াও বেশিরভাগ জায়গাতেই এখন ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ নীতি চলছে।

প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে, আবেদন-নিবেদন-জরিমানা করে, নিয়ত মৃত্যুর পরিসংখ্যান দেখানোর পরও অবশ্য অনেকে মাস্ক পরতে চান না। এটা বড়লোকের রোগ, গরিবদের করোনা হয় না, আমার করোনা হবে না, মুখ-নাক ঢাকলে গরম লাগে, শ্বাস নেওয়া যায় না, এ রকম ওজর-আপত্তি শোনা যায়। এক্ষেত্রে অনেকেই আপসহীন!

বাঙালি বেপরোয়া ও অপরিণামদর্শী জাতি, তাদেরকে মুখোশ পরানোর অভ্যাস করানো কঠিন। কিন্তু যারা উন্নত জাতির তকমা নিয়ে বিশ্বে অহংকার করছে, তাদের মধ্যেও মুখোশ পরার আগ্রহ কম। এমনকি তারা মুখোশের বিরুদ্ধে রীতিমতো আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। ‘মুখোশ খুলে ফেলো’—লন্ডনের রাস্তার পাশে এই দেওয়াল লিখন অনেকেরই নজর কেড়েছে। শুধু লন্ডন নয়, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে বহু মানুষ উচ্চকণ্ঠে এই ঘোষণা দিয়েছেন। মুখোশ কেবল মুখোশ নয়, তা নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। কোভিড সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রতিবাদে দেশে দেশে মিছিল-সমাবেশ বিক্ষোভ হয়েছে, এখনো হচ্ছে। সকলেরই দাবি : কোভিডের ভয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্তব্ধ করে রাখা আর চলবে না। বাংলাদেশের মাস্ক-বিরোধীরা অবশ্য অতটা বিপ্লবী হন নাই। তারা নীরবে মাস্ক প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেউ পকেটে রেখেছেন। কেউ থুতনিতে ঝুলিয়েছেন। কেউ-বা এটা পরার প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করেননি। এজন্য দেওয়াল লিখন, মিছিল, সমাবেশ কিংবা ভাঙচুর ুচালাননি।

বহু মানুষের থুতনির তলায় মাস্ক বিরাজমান—মাদুলি বা তাবিজের মতো। তাদের বোধ হয় দৃঢ় বিশ্বাস যে শরীরের সঙ্গে লেগে থাকলেই ভাইরাস পর্যুদস্ত হবে। সন্ধ্যা হলেই গলায় তাবিজের মতো মাস্ক ঝুলিয়ে কফিশপ, চায়ের দোকানের আলো-আঁধারিতে চলে আড্ডার ফোয়ারা। বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে চলে মাস্কবিহীন মানুষের উপচে পড়া ভিড়!

নিজেরা মাস্ক না পরলে কী হবে, সকলেরই যে মাস্ক পরা উচিত, এ ব্যাপারে কিন্তু আমাদের দেশে বিরাট ঐকমত্য রয়েছে। আর এ ব্যাপারে মাস্কবিহীনরাই বেশি সোচ্চার। তাদের মুখেই বেশি শুনবেন, ‘বাজার গিয়ে দেখুন, বেশির ভাগ লোকেরই মাস্ক নেই।’ ফেসবুক, টিভি থেকে সংবাদপত্র, অনলাইন পত্রিকা সর্বত্র এক অনুযোগ, আমজনতা বেশির ভাগই দায়িত্বজ্ঞানহীন। লোকে মাস্ক না পরে খেয়ালখুশিমতো ঘুরছে। অবশ্য নিজে মাস্ক না পরে কিংবা পকেটে বা থুতনিতে মাস্ক ঝুলিয়ে অন্যরা ঠিকঠাক মাস্ক পরছে না বলে গরমাগরম বক্তৃতা দেব, এটাই বাঙালির মাস্কবাদ!

যাহোক, গত এক বছরে মাস্কের অনেক প্রকারভেদও দেখা গিয়েছে। বাড়িতে পুরোনো টিশার্ট কেটে বানানো বা রুমাল বেঁধে বানানো মাস্ক বাদেও এন-৯৫ মাস্ক বা ডিসপোসেবল সারজিকাল মাস্ক ব্যবহারকারীর সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম নয়। এছাড়া রয়েছে নাকে পিন লাগানো ‘কোন্’ মাস্ক, থ্রি-প্লাই মাস্ক, ভাল্বযুক্ত মাস্ক, পলিকার্বনেট, রেক্সিন ইত্যাদি মাস্ক । এছাড়া বিভিন্ন সংস্থার ছাপমারা, নকশা করা, নানা রঙের মুখোশ তো আছেই।

বাজার অর্থনীতিও বসে নেই। মাস্ক পরার ঘোষণা আসার পরপরই দুনিয়া জুড়ে শুরু হয় বেপরোয়া মার্কেটিং। জামা বা সুটের সঙ্গে রং মিলিয়ে তো বটেই, মোজা আর অন্তর্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যযুক্ত মাস্ক, নারীদের জন্য বড়ো আকারের প্রিন্টেড মাস্ক, সুন্দর কারুকার্য করা বা জালিকাটা, ডিজাইনার মাস্ক, এমনকি রত্ন-খচিত মাস্ক সবই বিক্রি হছে পুরোদমে। ফেলো কড়ি পরো মাস্ক!

মহামারির অতি উদ্বেগকে পুঁজি করে মাস্ক-এর কালোবাজারি এবং নকল মুখোশের কারবার দারুণ ফুলে-ফেঁপে উঠেছে এই দুঃসময়ে। ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদের দেশেও মুখোশের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। প্রথম দিকে অনেক অনেক উচ্চমূল্য দিয়েও মুখোশ পাওয়া যেত না। অনেক তো মুখোশ আমদানি করে, মুখোশ তৈরি ও বিক্রি করে, মুখোশ সরবরাহে নয়-ছয় করে বড়লোক হয়ে গেছে। মুখোশ নিয়ে এ ধরনের দুই নম্বরি করেও অনেকে পার পেয়ে গেছেন। দু-এক জন অবশ্য ধরাও খেয়েছেন। সমাজে তাদের মুখোশ খসে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে সাহেদ, ডাক্তার সাবরিনা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার শারমিন জাহানের নাম উল্লেখ করা যায়।

মুখোশ কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক আগে থেকেই পরিচিত। আমরাও তো সারাক্ষণ মুখোশ পরেই থাকি। থাকি না? শুধু মন্ত্রী, এমপি, আমলা, পুলিশ, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদদের দোষ দিলে তো আর চলবে না। যদি ভাবি, যারা ছলচাতুরী করে কেবল তারাই মুখোশ পরে, তাহলে ভুল ভাবি। টুকটাক মিথ্যে তো আমরা বলেই থাকি। যেই একটা মিথ্যে বলি, অমনি পরে নিই একটা মুখোশ। পরি না?

মুখোশ নিয়ে বাঙালির আগ্রহের কমতি নেই। আমাদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রাণীর মুখোশ নিয়ে যে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়, তা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৫৬ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে নির্মিত ও মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’। চলচ্চিত্রটি দর্শকনন্দিত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে মুখোশ নিয়ে একটি জনপ্রিয় গানের অংশ উল্লেখ করা যেতে পারে : 

‘ডোরা কাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়/ বাতাসের বেগ দেখে মেঘ চেনা যায়/ মুখ ঢাকা মুখোশের এই দুনিয়ায়/ মানুষকে কী দেখে চিনবে বলো...’

গাজী মাযহারুল আনোয়ারের এই কথাকে গানে রূপ দিয়ে ‘দস্যু বনহুর’ সিনেমায় নিজেই গানটি গেয়ে মানুষের মুখে মুখে জনপ্রিয়তা এনে দেন সংগীতজ্ঞ-কণ্ঠশিল্পী আজাদ রহমান। তখন অবশ্য মুখোশটাকে খারাপ চোখে দেখা হতো।

মুখোশ নিয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিরা অনেক মূল্যবান কথা বলেছেন। অস্কার ওয়াইল্ড বলেছেন, মুখ যা বলে তার চেয়ে অধিক বলে মুখোশ। মুখোশের সাহায্যে একজন মানুষ তার নিজের প্রকৃত রূপ সত্যিকারভাবেই প্রকাশ করতে পারে—যে রূপটি ঢাকা পড়ে থাকে তার চেহারার মাধ্যমে। এটা একটা নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দর্শক উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে। আরবি ভাষায় মুখোশের প্রতিরূপ ‘মাসখাহরা’, যার অর্থ ‘ধোঁকাবাজি’ বা ‘রূপান্তর’, আবার ইংরেজিতে এর অর্থ করা হয়—‘প্রচ্ছন্ন রূপ’। একজন ব্যক্তির মানসিক জগত্টা প্রকাশ পায় তার মুখের মাধ্যমে, আর এই মুখ অর্থাত্ তাকে শনাক্ত করার মূল জায়গাটাকে যখন সে ব্যবহার করতে চায় না তখন মুখোশ তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় তার ‘পরিচয়’ থেকে এবং তার মানসিক জগত্টাকে প্রকাশ করে একটি ভিন্ন ব্যক্তি হিসেবে। এ প্রসঙ্গে জে ফোরম্যানের ব্যাখ্যা : ‘মুখোশ তার পরিধানকারীকে মুক্তি দেয় সকল ধরনের সংকোচ, নিয়মকানুন ও প্রাত্যহিক জীবনের বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় থেকে। তবে এটা একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় বিশৃঙ্খলা, বিনাশ ও পরিবর্তনশীলতা, যা আমাদের সঙ্গেই আছে।’ মুখোশের স্বরূপ উদ্ঘাটনে উনিশ শতকের প্রভাব বিস্তারকারী ফরাসি লেখক ভিক্টর হুগো বলেছেন, নৈতিকতা একটা ছদ্মবেশ, অনৈতিকতা মুখোশ। মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক মার্টি রুবিনের ভাষায়, ‘Behind every mask there is a face, and behind that a story’—অর্থাত্ ‘প্রত্যেক মুখোশের আড়ালে থাকে একটা মুখশ্রী, তার আড়ালে থাকে একটা গল্প।’ আসলেই কলঙ্ক ঢাকতেই আমরা মুখোশের আড়ালে মুখ লুকাই, কিন্তু লুকানো মুখের গল্পটা কি অত সহজে লুকানো যায়? সে গল্পটা যে সুখকর নয় এবং লুকানোও যে সহজ নয় তা তো জানা কথা। তবুও মুখোশের আড়ালে মুখ লুকাবার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা আমাদের। বোধ করি এজন্যই মুখোশ বাঙালি সংস্কৃতির একটা অনুষঙ্গ।

পুনশ্চ :

একটি ময়না পাখি কথা বলতে পারত। একদিন একজন ব্যক্তি পাখিটির কথা বলতে পারার পরীক্ষা নিতে তার নাম জানতে চাইল।

পাখিটি বলল : ময়না।

ঐ ব্যক্তি পাখিটির মুখ থেকে আরো কথা শোনার জন্য বলল, তুমি আমার কাছে কিছু চাইতে পারো। পাখিটি একটুও না ভেবে বলে বসল, মুক্তি, মুক্তি চাই বন্ধু! এই খাঁচাবন্দি জীবন থেকে মুক্তি পেলেই সবচেয়ে খুশি হব।

এই কথা শুনে ব্যক্তিটি নির্বাক হয়ে গেল। মনে মনে বলল, মুক্তি! সে তো আমরাও চাই। আমাদেরই তো বেশি প্রয়োজন আজ মুক্তির। বিশেষ করে এই মুখোশপরা সমাজ থেকে মুক্তি!

n লেখক : রম্যরচয়িতা