নন্দীগ্রামের ভোটযুদ্ধ এবং একজন মীনাক্ষী

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২১, ২১:৩৪

গতকাল পয়লা এপ্রিল ছিল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের সবচেয়ে হাই ভোল্টেজ দিন। পশ্চিমবঙ্গের স্যাটেলাইট সংবাদ চ্যানেলগুলোতে আমরা দিনভর দেখেছি ধাওয়া ও ুপালটা ধাওয়ার বিচিত্র দৃশ্য। একদিকে প্রার্থী ছিলেন বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা ব্যানার্জি। কার্যত নন্দীগ্রামে গতকালের ভোটপর্ব ছিল পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভার নির্বাচনের অ্যাসিড টেস্ট। এই অ্যাসিডে বিজেপি হয় গলে যাবে, নয়তো তৃণমূল কংগ্রেস।

নন্দীগ্রামে দুটি প্রশাসনিক ভাগ আছে, যার একটিতে মুসলিম রয়েছে প্রায় ৩৫, অন্যটিতে প্রায় ১২ শতাংশ। ৩৫ শতাংশ যেখানে, সেখানে মোট ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, মমতার শতভাগ ভরসা এই মুসলিম ভোটাররা। কারণ তারা বিজেপিকে ভোট দেবে না। অন্যদিকে বিজেপি সেটা বুঝতে পেরে ধর্মের তাস খেলছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলোতে উঠে এসেছে। বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু নন্দীগ্রামের জনপ্রিয় নেতা। তার এককালের সুপ্রিম নেত্রী মমতাই এখন তার প্রতিপক্ষ। এজন্য উত্তেজনার পারদও ছিল ভয়াবহ। আমরা ফেসবুকে, পশ্চিমবঙ্গের টিভি ও সংবাদমাধ্যমে দেখেছি, ভোটের প্রচারে নেমে মমতা ব্যানার্জি সেখানে সারাক্ষণ নাম করে এবং না করে শুভেন্দু ও তার পরিবারের প্রতি বিষোদ্গার করেছেন। শুভেন্দুরাও নানাভাবে অস্বস্তিকর কথা বলেছেন। স্থানীয় মানুষেরাও বলেছেন, নন্দীগ্রামে যেভাবে ভোটের প্রচার হলো, তাতে লজ্জাই লাগছে। এসব বাজে কথা তারা আগে কখনো শোনেননি। আর এসবের মধ্যে এক অকুতোভয় নারী অলক্ষ্যে ভোটের প্রচার করে চলেছেন। তার নাম মীনাক্ষী মুখার্জি। মাত্র ৩৭ বছর বয়স তার। দেখলে অবশ্য ২৭-এর বেশি বলে মনে হয় না। তিনি বর্ধমানের মেয়ে, কিন্তু সংযুক্ত মোর্চা তাকে ১০ মার্চ হাইভোল্টেজ নন্দীগ্রামে প্রার্থী করেন। একজন নারী কতখানি পরিশ্রমী ও সাহসী এবং একনিষ্ট হতে পারেন মীনাক্ষীর ভোটের প্রচারণা না দেখলে বোঝা যাবে না। ফেসবুক, ইউটিউবের বদৌলতে সেসব দৃশ্য আমরা বাংলাদেশ থেকেও দেখতে পারছি।

মীনাক্ষী কোন দলের প্রার্থী সেটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো এক অচেনা সাধারণ নারীর দুঃসাহসী এবং জেদি লড়াই। যে নন্দীগ্রামকে কেন্দ্র করে ১১ বছর আগে বাম-শাসনের ৩৪ বছরের যবনিকা পতন ঘটেছিল, সেই এলাকাতেই এবার ফের স্লোগান উঠেছে—‘হাল ফেরাও, লাল ফেরাও’। পশ্চিমবঙ্গে এখন দিনের বেলা ৩৭ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। রীতিমতো দাবদাহ চলছে। এই অবস্থাতেও ভোটের প্রচারণায় অনেক ভিডিওতে দেখা গেছে, মীনাক্ষীর কপাল-গলায় টপ টপ করে ঘাম ঝরছে, কিন্তু ভাষণে তিনি এতটাই মগ্ন যে, ঘাম মোছার সময় নেই। রানি রঙের কুর্তা, সাদা সালোয়ার ও উড়নির ওপর লাল রঙের দলীয় উত্তরীয় পরা অবস্থায় একটি সভা শেষে এক সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করলেন—দিনে তিনি কয়টা সভা করছেন? গামছায় মুখ মুছতে মুছতে মীনাক্ষী জবাব দিলেন, এখনো পর্যন্ত এক দিনে ১৮টা সভা করেছি। কত লোক হচ্ছে তার পথসভায়? তিনি অকপটে জানালেন, সবচেয়ে বেশি হয়েছিল ৪০০ জন। আর সবচেয়ে কম হয়েছিল মাত্র চার জন। অর্থাত্ লাল অনেকটাই ফিকে সেখানে, আরো অনেক জটিলতা তো আছেই।

কিন্তু একজন নারীর এই লেগে থাকার অপার ইচ্ছা, এটাই আমাদের কাছে অন্য বার্তা দেয়। বার্তা দেয় যে, সম্ভাবনা ক্ষীণ জেনেও একজন নারী তার শক্তির সবটুকু ব্যয় করতে পারেন, এমন নিষ্ঠা ও প্রচেষ্টা নারীদের এক বিস্ময়কর অন্তস্থ শক্তিও বটে। এজন্য মীনাক্ষীকে আমরা দেখতে পাই সাধারণ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভোটের প্রচারে। সাধারণ মেয়ে হিসেবে সাধারণ কথা বলছেন তিনি। ভোটে প্রভাব পড়ুক বা না-পড়ুক, এর একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলনের পর থেকে সিপিএমের যেখানে কোনো রাজনৈতিক জমিই ছিল না, সেখানে বেশ কিছু জায়গায় কম লোকজন নিয়েও মীনাক্ষী সাধারণ প্রার্থী হিসেবে পাড়ায় পাড়ায় পৌঁছতে পেরেছেন। একজন নারীকে সামনে রেখেই সিপিএম তাদের জমি উদ্ধারের যুদ্ধে নেমেছে—এর ভেতর দিয়েও সাধারণ নারীশক্তিকেই ভরসা মানা হচ্ছে। এটাও কম গুরুত্বপূর্ণ না।

 n লেখক : সাংবাদিক