ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের ধ্বংসলীলা চালানোর ঘটনায় এলাকাবাসী স্তম্ভিত। তারা বলেছেন, এসব উগ্র কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। অনেকের মতে, তারা তাদের সন্তানকে দিনি শিক্ষা দেওয়ার জন্য মাদ্রাসায় পাঠিয়েছেন, কিন্তু তাদের ভয় হচ্ছে, সন্তানেরা কী শিখছে? সেদিনের এসব কর্মকাণ্ডে মাদ্রাসার একশ্রেণির ছাত্রও অংশ নেয়। বারবার সহিংস ঘটনা ঘটছে। এই হামলার মধ্য দিয়ে তারা আমাদের কীসের বার্তা দিচ্ছে? এটা মেনে নেওয়া যায় না।
হেফাজতকর্মীরা সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রেস ক্লাব, গণগ্রন্থাগার, এসপি অফিস, ভূমি অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। তারা সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন পুড়িয়ে দিয়েছে। তারা মাইকে ঘোষণা দিয়ে হামলা করেছে বলে এলাকাবাসী জানান। এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে তারা আরো ভয়াবহ কাণ্ড ঘটাতে পারে। তাই জড়িতদের কঠোর শাস্তি প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী।
গতকাল বৃহস্পতিবার আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এত তাণ্ডব হয়নি, যেটা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সে সময় যে তাণ্ডব করেছে, আপনারাও তা করছেন। আপনাদের মধ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চরিত্র ফুটে উঠেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনায় হেফাজতে ইসলামের হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা গতকাল পরিদর্শন করেন ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি। এ ঘটনা নিয়ে সেখানকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বলেন, কিছু রাজনৈতিক নেতা ওপরে ওপরে দলের পক্ষে কথা বলছেন, ভেতরে ভেতরে হেফাজতের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছেন। তবে মনে রাখতে হবে, জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)কে লালন-পালন করার খেসারত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারকে দিতে হয়েছিল। জেএমবি একযোগে একই সময়ে ৬৩টি জেলায় সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। অনুরূপভাবে হেফাজতকে লালন-পালন করা হলে ভয়াবহ খেসারত দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনগণ বলেন, দয়া করে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। তাদের এ ধরনের নির্যাতন আমরা আর দেখতে চাই না। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে আপনাদেরও খেসারত দিতে হবে।
আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ গতকাল ক্ষতিগ্রস্ত প্রেস ক্লাব ও সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। এলাকাবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা একা নন। ২০ কোটি জনগণ আপনাদের পাশে আছে। আমরা জনগণের সহযোগিতায় ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করব। সহিংসতাকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছেন। নবি করিম (স.) শান্তিপূর্ণভাবে ধর্ম প্রচার করেছেন, তিনি কখনো সহিংসতা করেননি। সব ধর্ম ও সব ধর্মের মানুষ তার কাছে নিরাপদ ছিল। তিনি তার উম্মতদের সব ধর্মের মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন।’ আইজিপি বলেন, ‘আমরা দেখছি, প্রায় প্রতি বছরই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এমন ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটছে। একইভাবে হাটহাজারীসহ কয়েক জায়গায় হামলা হয়েছে। বারবার রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করা হয়। বারবার কেন রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ওপর আঘাত করা হচ্ছে? তাদের অবস্থানটা কি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে?’
আইজিপি আরো বলেন, ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এত তাণ্ডব হয়নি, যেটা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হয়েছে। এমনকি হরতালের দিন নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় একজন সাংবাদিককে আটকে রেখে কাপড় খুলে তার ধর্ম চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ’৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী করেছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ভূমি অফিসের সব কাগজপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা দেখে মনে হচ্ছে, গানপাউডার দিয়ে পোড়ানো হয়েছে। এটা ধর্মের নামে নাশকতা। আপনারা প্রতিবাদ করেন, কিন্তু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন পুড়িয়ে দেওয়া প্রমাণ করে যে এটা প্রতিবাদ নয়। সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা।’ তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩২ লাখ মানুষের বসবাস। এখানে ৫৭৬টা মাদ্রাসা আছে। এসব মাদ্রাসায় ১ লাখ ৩ হাজার ছাত্র পড়াশোনা করে। জনগণ বছরে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা এসব মাদ্রাসার ছাত্রদের পড়াশোনার জন্য দান করে থাকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, এই খরচ আপনারাই দিচ্ছেন। দিনের খেদমতের জন্য দিচ্ছেন। আসলেই তারা দিনের খেদমত করছেন? বারবার তারা সহিংসতার ঘটনা ঘটাচ্ছে। কিছু হলেই তারা ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলছে।
আইজিপি বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীকে স্পষ্ট করে বলতে চাই, ২০ কোটি বাংলাদেশি আপনাদের সঙ্গে রয়েছে। একসঙ্গে আমরা ভয়কে অতিক্রম করতে পারব। কোনো বিশেষ গোষ্ঠী কোনো একটি অঞ্চলকে উপদ্রুত এলাকা হিসেবে পরিণত করবে—এটা হতে দেব না। হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করুন। ২০ কোটি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।’ পুলিশপ্রধান বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মানুষের নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে ঘুমানোর অধিকার আছে। এই অধিকার আমরা নিশ্চিত করব। সাহস রাখুন, ধৈর্য হারাবেন না।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে যার যার ধর্ম পালন করে থাকে।
এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন র্যাবের ডিজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন, অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মনিরুল ইসলাম, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ারা হোসেন, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ডিজি হায়দার আলী খান ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ মার্চ হেফাজতের হরতালে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সকাল থেকেই হরতাল-সমর্থকেরা বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুরসহ অগ্নিসংযোগ করে।
সংশোধনী :১ এপ্রিলে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় ‘হেফাজতের হামলা, ঢাকাসহ ৯ জেলায় ৪৩ মামলা’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের একাংশে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হবে তিনি পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি।
