কৃষি অর্থনীতির রূপান্তরের কতিপয় দিক

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২১, ২১:৪৬

অতি সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, বিশ্বে যত রকমের কৃষিপণ্য উত্পাদিত হয়, এসব পণ্য বংলাদেশের মাটিতে ফলানো সম্ভব, যার ফলে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ কৃষিতে রোল মডেল। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নে গত কয়েক বছরে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে বিশ্বে। যে কারণে কৃষিবিষয়ক গবেষণার জন্য আর বিদেশের দ্বারস্থ হতে হয় না।

কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সমর্থ ও সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট কৃষিবিষয়ক গবেষণাগার ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলো। তবে এক্ষেত্রে আরো ব্যাপক গবেষণা ও উন্নয়নের অবকাশ রয়েছে নিশ্চয়ই, যেমন—চরাঞ্চল, উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল ও হাওর এলাকায় কীভাবে কৃষি উত্পাদন বাড়ানো যায় সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও ফলদায়ক গবেষণার আবশ্যকতা রয়েছে। এর পাশাপাশি গুরুত্ব আরোপ করতে হবে যন্ত্রনির্ভর কৃষির ওপর, যা সরকার বাস্তবায়ন করছে পর্যায়ক্রমে।

বর্তমান জনবান্ধব ও কৃষিবান্ধব সরকারের লাগসই কৃষিনীতির বাস্তবায়নসহ যথাসময়ে কৃষকের হাতে উন্নতমানের বীজ ধান, ধানের চারা, সেচসুবিধা, ডিজেল ও বিদ্যুত্ সর্বোপরি বালাইনাশক পৌঁছে দেওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে ধানের বাম্পার ফলন হচ্ছে। তবে স্বাধীনতার ৫০ বছর হতে চললেও অদ্যাবধি একটি সমন্বিত ও আধুনিক কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি। ফলে একদিকে উত্পাদিত ফসল ও পণ্যদ্রব্যের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয় কৃষক; অন্যদিকে সেসব পণ্য উচ্চমূল্যে কিনতে হয় ভোক্তা তথা ক্রেতাসাধারণকে। সে অবস্থায় দেশে ধান-চাল-পাটসহ কৃষিজাত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার জন্য তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত একটি আধুনিক ও সমন্বিত মার্কেটিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।

কৃষি সার্বিক খাদ্যের জোগান দেয়, কৃষি থেকে উত্পাদিত শর্করা জাতীয় খাদ্য চালে স্বনির্ভরতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বাংলাদেশ, যা দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য। গম উত্পাদনে দেশ অনেক পিছিয়ে থাকলেও এটি শর্করা খাদ্যের চাহিদা মেটায়। শাকসবজি উত্পাদনে দেশ বিশ্বে তার স্থান তৃতীয় এবং মাছে স্বনির্ভরতা অর্জনের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে দেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৮-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উত্পাদনে বাংলাদেশ ৩য় স্থান এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উত্পাদনে ৫ম স্থান অধিকার করেছে, ডিম উত্পাদনেও বাংলাদেশ স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে, প্রাণিসম্পদে প্রবৃদ্ধির হার কম হলেও গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি ইত্যাদি পালনে প্রায় সাম্প্র্রতিক সময়ে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধন করেছে। শিল্প খাতের কাঁচামাল সরবরাহে ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিতে মূল্যবান অবদান রেখে আসছে কৃষি খাত। সাম্প্রতিক সময়ে কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্যগুলো রপ্তানি করে দেশ ১ হাজার ২৬ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে।

চলমান করোনা মহামারিতে কৃষির অবদান সবচেয়ে বেশি, বর্তমানে জিডিপির কৃষির অংশ ১৫ শতাংশের নিচে এবং কৃষিতে নিয়োজিত কর্মক্ষম জনশক্তির সংখ্যা ৪০.৬ শতাংশে নেমে এলেও এখনো কৃষি ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির জীবনীশক্তি’। তাছাড়া সার্বিক জিডিপিতে কৃষির রয়েছে পরোক্ষ অবদান; বিশেষ করে বৃহত্ সেবা খাতের মধ্যে পাইকারি ও খুচরা বিপণন, হোটেল ও রেস্তোরাঁ এবং পরিবহন, সংরক্ষণ ও যোগাযোগ খাতের প্রবৃদ্ধিতে এ খাতের রয়েছে মূল্যবান অবদান। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে ৩০ মে, ২০২০ পর্যন্ত দেশে লকডাউনের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে কৃষি বাদে সব খাতের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। গত ৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে ২০২০—এই ৬৫ দিন ঘোষিত ছুটির কারণে নিম্ন মধ্যবিত্ত ৫ কোটি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ১ কোটি ১৯ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে, দরিদ্র থাকা ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ থেকে ২ কোটি ৫৫ লাখ হতদরিদ্র হয়েছে, ৯ মে থেকে ৩০ মে ২০২০ ব্র্যাকের এক জরিপে বলা হয়েছে কোভিড-১৯ এর ছুটির কারণে ৯৫ শতাংশ মানুষ উপার্জনের দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ৫১ শতাংশ মানুষ খানাভিত্তিক আয়ে শূন্যতে নেমেছে, ৬২ শতাংশ মানুষ চাকরি থেকে উপার্জনের সুযোগ হারিয়েছে এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেবা খাত। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন বলেছে সরকারঘোষিত ছুটিতে ৫০ লাখ শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হোটেল রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকায় অনেক মানুষ চাকরি হারিয়েছে।

বিলস-এর তথ্য মতে, কোভিড-১৯-এর প্রভাবে ইনফরমাল খাতে কর্মরত ১ কোটি মানুষ বেকারত্ব বরণ করেছে এবং পোশাকশিল্পে কাজ হারাচ্ছে প্রতি দিন গড়ে ৫০০ শ্রমিক কর্মচারী। বিষয়টি এখানেই শেষ নয়, বিদেশ থেকে যেসব লোকজন দেশে ফিরছে কর্মহীন হয়ে, তাদের সিংহ ভাগই গ্রামের মানুষ। তারা এখন কী করবে? উত্তর একটাই—কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যবসা এবং সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এই অবস্থাকে কাজে লাগাতে না পারলে বেকারত্ব/দারিদ্র্য একই সঙ্গে চলবে, যা অনেকের জন্য গ্রামে টিকে থাকা কঠিন হবে বলে প্রতীয়মান হয়। আবার গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখছে এসএমই খাত। কিন্তু করোনার কারণে গ্রামীণ ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বিক্রি ও উত্পাদন উভয়ই কমেছে, পর্যটনশিল্প একেবারেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। দেশে মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬২ শতাংশই কৃষি, মত্স্য ও বনজ খাতে নিয়োজিত। হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে নিয়োজিত ১৪ শতাংশ মানুষ এখন ব্যবসায়ে লোকসান গুনছে প্রতিনিয়ত, যার একটি বড় অংশই রয়েছে গ্রামে। সেখানে অপ্রতিষ্ঠানিক খাতে গত জুলাই-ফেব্রুয়ারি ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ৮.১০ শতাংশ আর আদায় কমেছে ৬.২১ শতাংশ। গত অর্থবছরে জুলাই থেকে মে পর্যন্ত কৃষি ও পল্লি ঋণ কর্মসূচির আওতায় ঋণ বিতরণ হয়েছে ১৮ হাজার ৫৫ কোটি টাকা, যা এর আগের বছর একই খাতে ছিল ২০ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা, অর্থাত্ ঋণ বিতরণ কমেছে ১ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। গত বছর ঋণ আদায় হয়েছে ১৮ হাজার ২৭২ কোটি টাকা, যা এর আগের বছর একই সময়ে ছিল ২০ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা, অর্থাত্ ঋণ আদায় আলোচ্য সময়ে কমেছে ২ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা।

গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির মূলত তিনটি চালিকাশক্তি যেমন :শহর থেকে পাঠানো টাকা, কৃষি ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এখন শহরে বেসরকারি খাতে কোনো কাজ নেই বিধায় লোকজন গ্রামে ভিড় করছে, যা সংকট বাড়াচ্ছে। গতবারের বোরো ফসল ভালো হলেও তা গ্রামেই পড়ে রয়েছে বিধায় গ্রামে মূলধন বাড়ছে না। করোনার বিস্তার ঠেকাতে লকডাউন গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা নেমেছে তা এখনো কাটেনি এবং পণ্য সরবরাহের গতিধারা ভেঙে পড়ায় কৃষক ক্ষতিতে পড়েছে, যা অপূরণীয়। রেমিট্যান্স নিয়ে যারা বিদেশ থেকে গ্রামে ফিরেছে তারা কি কৃষিতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে? যদি হয়, তাহলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে তা করতে পারে। কারণ সরকার তার বাজেট ব্যবস্থাপনায় এ খাতে প্রণোদনার ব্যবস্থা রেখেছে এবং সনাতন কৃষি পরিহার করে এই খাতে বিনিয়োগ খুব লাভজনক হবে। সরকারের পক্ষ থেকে সেসব উদ্যোক্তার প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিতে হবে, যা সময়ের দাবি। তাছাড়া রেমিট্যান্স অর্জনকারীদের টাকা উত্পাদনশীল খাত, যেমন—পোলট্রি ও ডেইরিতে ব্যয়িত হতে পারে। কৃষিপণ্যের ব্যবসায় একটি সহজ উদ্যোগ হতে পারে। আবার যারা কৃষিপণ্য নিয়ে বসে আছে, তারা যেন সরকারি/বেসরকারি পণ্য বাজারজাতকরণ করতে পারে বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে, সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। এ দুর্যোগের সময়ে কৃষকরা করোনার ভয়কে উপেক্ষা ও কঠোর পরিশ্রম করে যে শস্য ফলিয়েছেন, তা দেশকে বাঁচিয়ে রাখছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘কৃষিঋণ’ বিভাগের বরাতে জানা যায়, সরকারঘোষিত ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মাত্র ৫ হাজার কোটি টাকা কৃষকদের জন্য হলেও এ প্যাকেজের অর্ধেক ঋণও বিতরণ করতে পারেনি ব্যাংকগুলো। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে সব কটি ব্যাংক মিলিয়ে কৃষকদের ১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে এবং সেই হিসাবে এ প্যাকেজের বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪২.৪৪ শতাংশ। কৃষকের হিসাবের সংখ্যা বাংলাদেশ ব্যাংক পেয়ে থাকে যেসব ব্যাংক কৃষিঋণ প্রদান করে সেসব প্রতিষ্ঠান থেকেই, প্রতিবেদনের মাধ্যমে। এ সংখ্যার মূল উত্স কী? নিশ্চয়ই ঋণ বিতরণের হিসাবের সংখ্যাই হবে কৃষকের হিসাব। তাহলে ২০১০ সাল থেকে যে কৃষকের হিসাব সার বিতরণ কার্ডের ভিত্তিতে খোলা হয়েছে, তার সংখ্যা কত? বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে যেসব হিসাবের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে, তার ভিত্তি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বা ‘ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশেন’। অন্যদিকে সূত্রমতে, ২০১৯ সালে কৃষকের হিসাবগুলোতে জমার পরিমাণ ছিল ৩৫১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। ২০২০ সালে জমার পরিমাণ বেড়ে ৪০৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এ পরিসংখ্যান যদি সঠিক হয়, তাহলে অনুমান করা যায়, কৃষকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তারা আর ঋণে জর্জরিত নন। তবে প্রশ্ন হলো কোন শ্রেণির কৃষক এ ধরনের হিসাবের মালিক। তাদের সংখ্যা কত? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি, বিশেষত গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরের প্রশ্নে। এখনো মোট বিনিয়োগের মাত্র ৫ শতাংশ এবং মোট বাজেটের মাত্র ১১ শতাংশ, যা বাড়াতে হবে।

বিগত ৫০ বছরে পর্যালোচনায় কৃষিতে লক্ষণীয় অর্জন থাকলেও প্রধান কিছু ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে, যা দূর করার উদ্যোগ তেমন দেখা যায়নি, যেমন তদারকি ও তথ্য সংগ্রহের যথাযথ পদ্ধতির ঘাটতি, পুরোনো সরবরাহ শৃঙ্খল ও বিপণনব্যবস্থা, সরকারের মূল্য সহায়তা ব্যবস্থা যথাযথ না হওয়ায়, প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপটের কারণে কৃষকদের নিম্ন আয়, একটি বড়সংখ্যক মানুষের জন্য খাদ্য ও পুষ্টিহীনতা সৃষ্টি, পানির মতো সম্পদ ব্যবহারে অদক্ষতা এবং নিম্ন উত্পাদনশীলতা ইস্যু। চলমান মহামারিতে পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো ফুটে উঠেছে, এবং বর্তমান মহামারি নতুনভাবে রূপান্তরের সুযোগ সৃষ্টি করেছে যা কাজে লাগাতে হবে। কৃষি খাতটিকে ভবিষ্যত্সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তিতে পরিণত করতে হলে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সুশাসনের সমন্বয় ঘটাতে হবে।

n লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক