মনের খাদ্য বই!

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২১, ২১:৪৮

অলোক আচার্য

অনেকেই বইপড়াকে নিজেদের শখ বলে উল্লেখ করে থাকেন। কিন্তু বাস্তবে শখের বশে কতটা বইপড়াকে আপন করেন সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। একটা সময় ছিল যখন বই পড়ার প্রতি ছেলেমেয়েদের মধ্যে তীব্র আগ্রহ লক্ষ করা গেছে। বই হাতে পেলেই তা পড়ে দেখার এক ধরনের কৌতূহল ছিল লক্ষণীয়। তবে বলছি না যে সবার মধ্যেই এ প্রবণতা ছিল, কিন্তু তা এখনকার চেয়ে অনেকটাই বেশি ছিল। আজকালকার ছেলেমেয়েদের বই পড়ার প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। নতুন বই পেলে যে একধরনের মুগ্ধতা তৈরি হয় তা ঠিক; কিন্তু কয়েক মাস যেতেই সেই মুগ্ধতা আর থাকছে না। মূল বই থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ঝুঁকছে গাইড বই, লেকচার শিট, প্রাইভেট এসবের প্রতি। এসব কিছুই অবশ্য পরীক্ষায় ভালো করার জন্য। অবশ্য সচেতন অভিভাবকমাত্রই সন্তানের ভালো ফল আশা করেন। আমিও করি। কিন্তু ভালো ফল করতে গিয়ে যদি পাঠ্যবইয়ের বদলে গাইড বা প্রাইভেট বা লেকচার শিটের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায় তবে সেটা একদম ভালো কথা নয়। তারপর পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই যে জ্ঞানের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার তার খোঁজ এরা করছে না। ফলে জ্ঞান হয়ে পড়ছে সীমিত। সীমাবদ্ধ জ্ঞান দিয়ে মুক্ত আকাশের সন্ধান মেলে কি? মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে মুক্ত জ্ঞানের চর্চা থাকা আবশ্যক।

একজন ছাত্র তার মোবাইলফোনের স্ক্রিনের দিকে যে তীব্র আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে সেই আগ্রহ বইয়ের পৃষ্ঠায় থাকলে কত ভালোই না লাগত। তবে বিষয়টা আমার ভালোলাগা বা মন্দলাগার না—বিষয়টা জাতির ভবিষ্যতের।

আমরা সবাই মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েও সারা জীবন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করে যাই। সেই যে ছেলেবেলায় ভাবসম্প্রসারণে পড়েছিলাম— ‘তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশুপক্ষী সহজেই পশুপক্ষী কিন্তু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় মানুষ’। এই প্রাণপণ চেষ্টাটা আমাদের অব্যাহত রাখতে হয়। আর তার জন্য যদি আমাদের কেউ প্রকৃত বন্ধু থাকে, তবে তা বই। আমাদের সঠিক পথ দেখাতে পারে বই।

বইপড়ার বিষয়টি নিয়ে লিখতাম না যদি আমার সহকর্মী সহকারী লাইব্রেরিয়ান পাঠ্যবইয়ের বাইরের বইপড়া নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা আমাকে না বলতেন। তিনি দুঃখ করে জানালেন, ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা লাইব্রেরির বই পড়তে আগ্রহী না। আমি জানি  বই পড়ানোর কাজটি সহজ না। জোর করে ওষুধ খাওয়ানো যায়, সে ওষুধ কাজও করে কিন্তু বই পড়ানো যায় না। বইপড়া বিষয়টি তখনই স্বাভাবিক মনে হবে যখন ভেতর থেকে এক ধরনের তৃষ্ণা জাগ্রত হবে। তিনবেলা খাওয়ার জন্য আমাদের যে হাহাকার, একবেলা হঠাত্ না খেলে যে ক্ষুধাবোধ তেমনি একবেলা বই না পড়লে যদি সেরকম কোনো বোধ হয় তখন বইপড়াটা মজ্জাগত হবে। অতিরিক্ত কোনো কাজ হিসেবে নয় বরং আর দশটা স্বাভাবিক কাজের মতোই বইপড়া একটি স্বাভাবিক কাজ হবে। বই যদি আমাদের আনন্দ উপকরণ হতে পারে তখন তা হবে মনের ক্ষুধা মেটানোর অন্যতম অনুষঙ্গ।

পাবনা