Åএবার উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ১০ কোটি কেজি
Åহোয়াইট ও ইয়োলো চা উদ্ভাবন
হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী, সিলেট অফিস
মার্চের প্রথম বৃষ্টিতে সিলেটের চা-বাগানগুলো সতেজ হয়ে উঠলে ‘চা-চয়ন’ শুরু হয় উত্সবের সঙ্গে। কিন্তু দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া টানা খরা বিপর্যয়ে ফেলে চা-বাগানগুলোকে। ‘এমন অবস্থা গত কুড়ি বছরের মধ্যেও দেখা যায়নি।’ এরকম মন্তব্য করে বাগান ব্যবস্থাপকেরা ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা একটা বৃষ্টির জন্য অধির অপেক্ষায় ছিলাম। প্রলম্বিত খরাসহ উদ্ভূত পরিস্থিতে সোমবার রাতে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টিতে স্বস্তি ফিরেছে বাগানসংশ্লিষ্টদের মধ্যে। এবার চা উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১০ কোটি কেজি নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৯ সালে দেশে চা উত্পাদনে রেকর্ড ছিল ৯ কোটি ৭০ লাখ কেজি।
চা-শিল্পকে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি
এদিকে হবিগঞ্জ জেলার বৃন্দাবন চা-বাগান এবার নতুন দুটি জাতের চা উদ্ভাবন করায় বেশ হইচই পড়েছে চা-প্রেমীদের মধ্যে। দীর্ঘ গবেষণার পর এই বাগানে ‘হোয়াইট’ ও ‘ইয়েলো টি’-এর অবিষ্কার চা-শিল্পকে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে, যদিও এর দাম কয়েক গুণ বেশি। চা-বাগান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া শুরুতে বাণিজ্যিকভাবে এই চা উত্পাদন সম্ভব হবে না। তবে সফলভাবে এই চা উত্পাদন হলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব।
সূত্র জানায়, গত ৩ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গল নিলামকেন্দ্রে সিলভার নিডেল গ্রেডের হোয়াইট টি নিলামে প্রতি কেজি বিক্রি হয় ৫ হাজার ১০ টাকা দরে। ইয়েলো টি গত ১৫ মার্চ চট্টগ্রাম চা নিলাম কেন্দ্র থেকে চায়ের পুরো লটটি কিনে নেয় শ্রীমঙ্গলের গুপ্ত টি হাউজ। পরে ১৮ মার্চ শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্রে ইয়েলো টি বিক্রি হয় ১২ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে।
‘চা অত্যন্ত সংবেদনশীল কৃষিপণ্য। এর জন্য সুষম আবহাওয়া প্রয়োজন’ মন্তব্য করে এম আহমদ টি অ্যান্ড ল্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের খান চা-বাগানের ব্যবস্থাপক হুমায়ূন কবির ইত্তেফাককে বলেন, ‘খরার মধ্যেও পাতি তোলার কাজ চলছে। বৃষ্টি হওয়ায় দুর্বাভনা কিছুটা দূর হয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে দেশের চায়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি চা উত্পদন হয় ৯ কোটি ৭০ লাখ কেজি। কিন্তু ২০২০ সালে করোনার কারণে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি বলে ৮ কোটি ৬৩ লাখ কেজি উত্পাদন হয়।
মার্চের শুরুতে রীতি অনুযায়ী চা-শ্রমিকেরা বাগানে বাগানে ‘পাতি’ তোলার কার্যক্রম শুরু করেন পূজা-পার্বণের মাধ্যমে। দেশের প্রাচীনতম চা-বাগান মালনীছড়া ও হিলুয়াছড়া চা-বাগানে ‘চা চয়ন’ উত্সব উদ্যাপিত হয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উত্সবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে। চা-বাগানের স্বত্বাধিকারী রাগীব আলী বলেন, ‘নতুন চাপাতা গজিয়েছে। মনে হয় করোনাকালে আমাদের বাগানের যে ক্ষতি হয়, তা পুষিয়ে উঠবে।’
চা চোরাচালান কঠোরভাবে দমন করতে হবে
প্রতি বছর শীতে চা-গাছগুলোর মাথা নির্দিষ্ট মাপে ছেঁটে ফেলা হয়। পরে বৃষ্টির স্পর্শে তিন-চার দিনের মধ্যে কুঁড়ি দেখা দেয়। তখন পুরো বাগান এলাকা সবুজে রূপ নেয়। ইদানীং চা উত্পাদন করে অনেক বাগানমালিক উত্পাদন খরচ ওঠাতে পারছেন না—এই মন্তব্য করে বিভিন্ন বাগান ব্যবস্থাপক বলেন, প্রতি কেজি চায়ের নিলাম মূল্য ১৪০-১৯০ টাকা। চোরাই পথে চা পাচার হয়ে দেশে আসে বলে বাজারমূল্য ওঠে না। একই মন্তব্য করে মৌলভীবাজর-মাধবপুর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক শফিকুর রহমান বলেন, ‘চা-বগানের ব্যাপারে সরকার বিশেষভাবে ভূমিকা না নিলে বাগানগুলো একসময় ধ্বংস হয়ে যাবে।’
দেশের ১৬২টি চা-বাগানের মধ্যে ১৩৮টি বাগানই সিলেটে—এই তথ্য দিয়ে নর্থ-সিলেট ভ্যালি টি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান নোমান হায়দার চৌধুরী বলেন, শুল্ক ছাড়া প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রদান করলে দেশের লাভ হবে। বাগানের উপকার হবে। তিনি বলেন, চা চোরাচালান কঠোরভাবে দমন করতে হবে। সূত্রমতে গত ৬ মার্চ সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার লালাখাল সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ১ হাজার ১২২ কেজি ভারতীয় চা-পাতাসহ ফখরুল ইসলাম নামে এক জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
টি পান্টার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিপিটিএবি) সদস্য সচিব জহর তরফদার বলেন, চায়ের চাহিদা বেড়েছে অভ্যন্তরীণ বাজারে। বাংলাদেশ চা-বোর্ডের উপপরিচালক (পরিকল্পনা) মুনির আহমেদ বলেন, আমদানিনির্ভর চা খাত গত তিন বছর ধরে রপ্তানিমুখী।
