নেতাকর্মীদের হত্যা, মামলা ও বাড়িঘরে তল্লাশির প্রতিবাদে গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে আয়োজিত সমাবেশে হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলেছেন, পুলিশ ও সরকারি দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের হেলমেটবাহিনী হেফাজতের ২০ কর্মী-সমর্থককে হত্যা করেছে। পুলিশ তাদের গ্রেফতার না করে উলটো হেফাজত নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে গ্রেফতার-হয়রানি করছে। আজ থেকে যদি আর কোনো হেফাজত কর্মী-সমর্থকের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়, কাউকে গ্রেফতার করা হয়, তাহলে হেফাজত আবার কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে। কেউ যদি চিন্তা করেন, বন্দুকের নল দিয়ে হেফাজত ইসলামকে শান্ত করে ফেলবেন, তাদের বলব, আপনারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন।
এদিকে রাজধানী ছাড়াও চট্টগ্রাম, গাজীপুর, বরিশাল, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে হেফাজত। অধিকাংশ স্থানে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও গাজীপুরে হেফাজত কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ২০ জন আহত, ২০ জনকে গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে। প্রসঙ্গত, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ব্রা?হ্মণবাড়িয়াসহ কয়েকটি জেলায় সহিংস ঘটনায় বেশকিছু প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে গত ২৮ মার্চ হরতাল পালন শেষে গতকাল দেশ জুড়ে বিক্ষোভের ডাক দেয় সংগঠনটি।
ঢাকার সমাবেশ ঘিরে দুপুর থেকেই মসজিদের উত্তর গেটের ভেতরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ-র্যাব সদস্য অবস্থান নেয়। প্রস্তুত রাখা হয় জলকামান ও সাজোয়া যান। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সমাবেশে সংগঠনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর সভাপতি আল্লামা মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব সভাপতিত্ব করেন। তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রতিটি গ্রামের বাড়িঘরে মানুষ পুলিশের ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারছে না। অবিলম্বে এমপি মুক্তাদির চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হোক। তিনি অভিযোগ করে বলেন, করোনা আতঙ্কের কথা বলে এখন মাদ্রাসা বন্ধের পাঁয়তারা চলছে। যদি এবার করোনার দোহাই দিয়ে মাদ্রাসা বন্ধ করা হয় তবে রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক বলেন, হেফাজত কারো তল্পিবাহক নয়। যখনই দেশের বিরুদ্ধে, ঈমান-আকিদার বিরুদ্ধে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হবে তখনই হেফাজত কারো রক্তচক্ষু পরোয়া না করে রাজপথে নেমে আসবে। তিনি বলেন, ২০টি মায়ের বুক খালি হলো। আইজিপি আপনাকে তো শোক প্রকাশ করতে দেখলাম না। আমি বিশ্ব মানবাধিকার কর্মীদের কাছে বলতে চাই, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বলতে চাই, যথাযথ তদন্ত করুন। মাদ্রাসায় অভিযানের নামে নাটক সাজানো হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমগুলোর আরো দায়িত্বশীল হওয়া দরকার। যথাযথ ঘটনা তুলে ধরা তাদের দায়িত্ব। আর ভুলক্রমে সাংবাদিকদের ওপর হেফাজতের কিছু কর্মী হামলা করে থাকতে পারে। আমরা এজন্য কেন্দ্রীয়ভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।
কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী বলেন, আইজিপিকে বলব, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেছে আওয়ামী লীগের হেলমেটবাহিনী, তাদের গ্রেফতার করুন। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করুন। মিডিয়ালীগ হবেন না। যুবলীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামার আহ্বান জানান।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ মিছিল সহকারে হেফাজত নেতাকর্মীরা চান্দনা চৌরাস্তা ঈদগাহ মাঠে সমবেত হয়। পরে তারা মিছিল নিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বের হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের মাঠের মধ্যেই সমাবেশ করার অনুরোধ করে। কিন্তু অনুরোধ উপেক্ষা করে হেফাজত নেতাকর্মীরা ঈদগাহ মাঠের ভিতর থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পরে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এক পর্যায়ে হেফাজতকর্মীরা চান্দনা চৌরাস্তায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ধাওয়া দেয়। হেফাজত কর্মীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুঁড়ে। এ সময় তাদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশসহ অন্তত ২০ হেফাজতকর্মী আহত হন। তাদের স্থানীয় হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে। পরে চান্দনা চৌরাস্তা এলাকা থেকে হেফাজতে ইসলামের অন্তত ২০ জনকে আটক করা হয়। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (ক্রাইম) জাকির হাসান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এদিকে সংঘর্ষের সময় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে আধাঘণ্টা সব প্রকার যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে দুর্ভোগ পোহান যাত্রীরা।
বরিশাল অফিস জানায়, বিকালে নগরীর বাজার রোডের জামেয়া আরাবীয়া খাজা মাঈনউদ্দিন মাদ্রাসা মাঠে হেফাজতের সমাবেশ হয়। কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির হাফেজ মাওলানা আব্দুল হালিমের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তৃতা করেন মাওলানা আবদুল খালেক হরিনাফুলিয়া, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা শেখ সানাউল্লাহ মাহমুদি প্রমুখ। এসময় বক্তারা গ্রেফতার নেতাকর্মীদের মুক্তি ও গণগ্রেফতারসহ সবধরনের হয়রানি বন্ধসহ পাঁচ দফা দাবি উপস্থাপন করেন। দাবি না মানলে কঠোর কর্মসূচির হুমকি দেন।
সিলেট অফিস জানায়, জুমার নামাজের পর নগরীর কোর্ট পয়েন্টে সমাবেশ করে হেফাজত। সমাবেশে বক্তারা বলেন, আমরা ইসলাম ও দেশকে বাঁচাতে মাঠে নেমে কতগুলো তাজা প্রাণ হারিয়েছি। আমরা এ সমাবেশ থেকে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে এবং আহতদের সুচিকিত্সার ব্যবস্থা করার জন্য রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সিলেট জেলার সভাপতি মাওলানা মুফতি মুহিব্বুল হক গাছবাড়ি, কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা রেজাউল করিম জালালী প্রমুখ।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, হেফাজতে ইসলামের ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশের কারণে গতকাল নিরাপত্তার স্বার্থে হাটহাজারী-খাগড়াছড়ি সড়ক সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে পুলিশ। এতে খাগড়াছড়ি-হাটহাজারী সড়কের উভয় প্রান্তে যানজটের সৃষ্টি হয়।
