বাংলার সংস্কৃতির বিশেষ অংশ জুড়ে রয়েছে সোনালি আঁশ খ্যাত জগদ্বিখ্যাত পাট। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্প-সাহিত্য, লোকজ সংস্কৃতি, নান্দনিকতা, জীবন-জীবিকা।
পাটের বহুমুখী ব্যবহার—ভেষজ চিকিত্সা, রসনা বিলাস, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড় মমতায় জড়িয়ে আছে। পেটে ব্যথা, মুখে অরুচি, বসন্ত রোগের মহৌষধ হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে গ্রামবাংলায় যুগের পর যুগ। পাটের নানামুখী উপকারিতা বয়োজ্যেষ্ঠ নানি-দাদি-মা-চাচিদের মুখে মুখে। পাটের তেতো খাওয়ার চল এখনো রয়েছে গ্রামগঞ্জে। চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখে পাটশাক খাওয়ার রেওয়াজ বহমান। পাটশাকের সঙ্গে কাসুন্দি এবং কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, শুকনো মরিচ খাওয়া শুধু এই বাংলাতেই দেখা যায়, পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। পাটের নানা আঞ্চলিক নাম রয়েছে। চট্টগ্রামে পাটশাককে ‘নারীশাক’ বলা হয়।
কবি আহসান হাবীবের রচনায় পাই—
মনা রে মনা কোথায় যাস?
বিলের ধারে কাটব ঘাস।
ঘাস কী হবে? বেচব কাল,
চিকন সুতোর কিনব জাল।
জাল কী হবে? নদীর বাঁকে
মাছ ধরব ঝাঁকে ঝাঁকে।
মাছ কী হবে? বেচব হাটে,
কিনব শাড়ি পাটে পাটে।
বোনকে দিব পাটের শাড়ি,
মাকে দিব রঙিন হাঁড়ি।
কৃষিনির্ভর গ্রামবাংলার গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে আছে দড়ি কাছি, ছালা, বস্তা, গালিচা, পাপোস, ঝটুন-ঝড়, সুতলি, পাটের ব্যাগ, চট, পাটের স্যুটকেস—যা পাট থেকেই তৈরি। রং-বেরঙের হাঁড়ি-পাতিল রাখার জন্যে গ্রামের নারীরা বিশেষভাবে বুননের মাধ্যমে পাট দিয়ে তৈরি করে থাকে বাহারি শিকা। পাটের খড়ি দিয়ে ঘরের বেড়া এমনকি ঘরের চালসহ পাটখড়ির জ্বালানির কদর এখনো আছে। আবার পাটখড়ির সঙ্গে গরুর গোবর লেপটে জ্বালানি তৈরির দৃশ্য এখনো দেখা যায়। আর এটি করে থাকে কৃষি এবং শিল্পের গোড়াপত্তন যাদের দ্বারা হয়েছে সেই আধুনিক সভ্যতার সূচনাকারী নারী।
পাট পরিবেশবান্ধব ফ্যাশন পণ্য। পাটের তন্তুকে বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে উন্নত মানের পলিথিন যেটি পচনশীল, টেকসই এবং সারা বিশ্বে সমাদৃত। পরিবেশকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে পাটের নানামুখী ব্যবহারের বিকল্প নেই। পাটের ভ্যানেটি ব্যাগ, জুতা, ভিসকস, জিওজুট, পাটের পাতা থেকে পানীয়, পাটকাঠি থেকে উন্নতমানের চারকোল, পাটের বীজ থেকে বিষ, পাটখড়ি থেকে হার্ডবোর্ড, কাগজ, ঢেউটিন তৈরি হচ্ছে, যার জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
বাংলাদেশের গর্ব—ড. মাকসুদুল আমীন পাটের জীবন রহস্য জীনতত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন। পাটের অংশ থেকে পলিমার ব্যাগ তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন মোবারক আহমদ খান, যেটি সম্পূর্ণ পচনশীল তথা পরিবেশবান্ধব।
