গত এক দশকে বাংলাদেশে মাদক পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করিয়াছে। একসময় দেশের যুবসমাজের মধ্যে ভারতীয় কফ সিরাপ ফেনসিডিলের আসক্তি ছিল একটি বড় সমস্যা। পরে সেই স্থান দখল করিয়া নেয় মিয়ানমার হইতে আসা উত্তেজক বড়ি ইয়াবা। বিভিন্ন পেশাজীবী ও নানা বয়সি মানুষের মধ্যে ইয়াবা আসক্তি মহামারির মতো ছড়াইয়া পড়ে। ২০১৭ সালে বিভিন্ন সংস্থা উদ্ধার করে ৪ কোটি ইয়াবা। এই পরিস্থিতিতে ২০১৮ সালে সরকার থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মডেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে। ইহাতে শুধু জুন মাস পর্যন্ত ১৫০ মাদক কারবারি বিভিন্ন তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। গ্রেফতার হয় ১৪ হাজার মাদক ব্যবসায়ী; কিন্তু এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে যেমন এই ধরনের অভিযানে প্রত্যাশিত সফলতা আসে নাই, তেমনি বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঘটিয়াছে একই ঘটনা। সাময়িকভাবে কিছুটা সফলতা আসিলেও মাদকাসক্তির কবল হইতে আমরা মুক্তি পাই নাই। সবচাইতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হইল, সরকারের কড়াকড়ি করিবার কারণে মাদক কারবারিরা কৌশল পালটাইয়া ফেলিয়াছে। তাহারা এখন অনলাইনে মাদকের কারবার চালাইয়া যাইতেছে বেপরোয়াভাবে। এই ডিজিটাল মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতিরোধে আমরা কতটা সক্ষম ও প্রস্তুত?
গত মার্চ মাসে চট্টগ্রাম হইতে দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয় যাহারা ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহারের মাধ্যমে ইয়াবার ব্যবসা করিত। ইয়াবাসেবীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা, বিজ্ঞাপন, বিপণন ও বিতরণ—সকল কাজই তাহারা এই তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া সম্পন্ন করিত। মাদকের স্পটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও নজরদারির কারণেই তাহারা এই বিকল্প পথ বাছিয়া লয়। এমনকি ফেসবুক গ্রুপ ব্যবহার করিয়া হাজার হাজার সদস্য প্রকাশ্যে গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সেবন ও বিক্রির প্রচার চালাইতেছে; কিন্তু এই ব্যাপারে সাইবার নজরদারি বৃদ্ধি তো দূরের কথা, মোবাইল ফোন ট্র্যাক করিয়া এই সকল মাদক ব্যবসায়ীকে পাকড়াও করিবার উদ্যোগও তেমন নাই। অবশ্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এই সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অভাব রহিয়াছে। প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামে সাইবার শাখা রাখিবার কথা বলা হইলেও এখনো ইহার বাস্তবায়ন হয় নাই। র্যাবের মাধ্যমে এই প্রকৃতির মাদক কারবারিদের উপর কখনো কখনো নজরদারি করা হইলেও তাহা পর্যাপ্ত নহে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকেও এই ব্যাপারে স্বয়ংসম্পন্ন করা প্রয়োজন।
শুধু ইয়াবা নহে, বর্তমানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ‘আইস’ও বেচাকেনা চলিতেছে। এই জন্য ব্যবহার করা হইতেছে ডার্কনেটও। যেহেতু মাদক ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের দেশে পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হইতেছে এবং মানুষ কিডনি, লিভার, ফুসফুসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অসুখে আক্রান্ত হইতেছে, তাই মাদকাসক্তি নির্মূলে আমাদের নিরলসভাবে কাজ করিয়া যাইতে হইবে। ল্যাটিন আমেরিকার দেশ মেক্সিকো ও কলম্বিয়া শক্তি প্রয়োগ করিয়াী মাদক সমস্যার মোকাবিলা করিতে পারে নাই। এই জন্য মাদকের মূল উত্স ও সরবরাহ চেইন ধ্বংসের ব্যাপারে আগে উদ্যোগ লইতে হইবে। বিপণন ও বিতরণ পর্যায়ে অব্যাহত রাখিতে হইবে অভিযান। তবে মাঠ পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বিক্রেতা বা মাদকসেবীদের চাইতে পূর্বে রাঘববোয়ালদের ধরা বাঞ্ছনীয়। নিরপরাধ মানুষ যাহাতে এই অভিযানে কোনো প্রকার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখিতে হইবে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মতো মাদক একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমস্যা। তাই সীমান্তে ইহার উত্পাদন বন্ধে ভারত ও মিয়ানমারের সহায়তাসহ আঞ্চলিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। মাদকের চাহিদা কমাইতে প্রয়োজন মাদকসেবীদের মোটিভেশন ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন সাধন। দরকার তাহাদের নিরাময় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়িয়া তুলিবার কথা আমরা প্রায়শ বলিয়া থাকি; কিন্তু বাস্তবে তাহার প্রতিফলন কতটুকু—তাহাও আমাদের ভাবিয়া দেখিতে হইবে।
