পৌরকরের পরিমাণ কত হবে তা নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) ভিন্ন ভিন্ন দাবি করেছে। সিটি করপোরেশনের দাবি, তারা বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে বছরে পাবে ৯০ কোটি টাকা। অন্যদিকে চবকের দাবি, প্রকৃত হিসাবে সিটি করপোরেশন পাবে মাত্র ৬ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত দুই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর উভয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে যৌথ সার্ভের সিদ্ধান্ত হয়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিগত একাধিক মেয়র ও প্রশাসক চট্টগ্রাম বন্দরের আয় থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ দাবি করে আসছেন। তাদের মতে, চট্টগ্রাম সিটির বিরাট অংশ জুড়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের স্থাপনা রয়েছে। একইভাবে প্রতিদিন চট্টগ্রাম বন্দরের শত শত ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, ট্রেলারসহ পণ্যবাহী ভারী যানবাহন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সড়ক ব্যবহার করে থাকে। ঐ সব ভারী যানবাহনের কারণে সড়কগুলো দ্রুত ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এতে সড়ক সংস্কার খাতে সিটি করপোরেশনকে বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের বিগত সময়ের বক্তব্য অনুযায়ী বন্দর কর্তৃপক্ষ সিটি করপোরেশনের চাহিদামতো পৌরকর প্রদান করে আসছে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রকৃত পৌরকর হিসাব না করেই জনগণের সুবিধার্থে করপোরেশনকে তাদের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আসছে। এমনকি এক্সেস সড়কসহ করপোরেশনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাহিদামতো থোক বরাদ্দও বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রদান করেছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরের যানবাহনের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত পোর্ট কানেক্টিং সড়কটি তাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে প্রদানের জন্য সিটি করপোরেশনকে জানিয়েছিল। কিন্তু সিটি করপোরেশন সাড়া দেয়নি বলে জানা যায়।
করোনার কারণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নির্দিষ্ট সময়ে না হওয়ায় প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত খোরশেদ আলম সুজন চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন করপোরেশন ও গ্রুপ অব কোম্পানির কাছে সিটি করপোরেশনকে সহায়তা বৃদ্ধির দাবি তোলেন। বন্দরের বার্ষিক আয়ের এক থেকে দুই ভাগ সিটি করপোরেশনকে প্রদানের দাবি জানান। তারই পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর হঠাত্ করে বন্দরের নিকট সিটি করপোরেশনের পৌরকরের দাবি কয়েক গুণ বেড়ে যায় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, গত বছরের জুলাই মাসের দাবিমতো বন্দর কর্তৃপক্ষ সিটি করপোরেশনকে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা পৌরকর প্রদান করে। কিন্তু তার কিছুদিন পর দুটি দাবিনামার প্রথমটিতে প্রায় ৮৭ কোটি টাকা এবং পরে প্রায় ৯০ কোটি টাকা পৌরকর পরিশোধের জন্য বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ পৌরকর ধার্যের মূল্যায়ন সঠিক হয়নি উল্লেখ করে তা প্রত্যাহার করতে বলে। বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, তাদের অধীনে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, হাসপাতালসহ মার্কেট, ইয়ার্ড, শেড, স্টোরেজ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা ও অফিস ভবন রয়েছে। এর মধ্যে শুধু অফিস, ইয়ার্ড, শেড, স্টোরেজ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা পৌরকর আরোপযোগ্য। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসার ভাড়া সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যে পরিমাণ কর্তন করা হয়, তার ভিত্তিতে পৌরকর নির্ধারিত হবে। একইভাবে স্টোরেজ শেডসহ অন্যান্য ভাড়ার ক্ষেত্রে স্বীকৃত গ্যাজেট রয়েছে। তাই কোনোভাবেই এগুলো বাণিজ্যিক রেটে ধরে পৌরকর নির্ধারণের সুযোগ নেই।
বন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, পৌরকর নির্ধারণ হবে স্থাপনার মাসিক ভাড়ার ওপর, কোনোভাবেই তার বার্ষিক আয়ের ওপর নয়। বন্দরের অফিস, মার্কেট, ইয়ার্ড, শেড, স্টোরেজ ও বাসা বাবদ মাসিক ভাড়ার পরিমাণ নির্ধারণ করে করপোরেশনের শুল্ক রুল ’৮৬ অনুযায়ী ১০ মাসের সাকল্যে ভাড়ার ওপর শতকরা ১৭ ভাগ হিসাবে বন্দরের পৌরকর দাঁড়ায় প্রায় ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা। আবার সম্প্রতি উচ্চ আদালতে একটি রায় অনুযায়ী পৌর কর শতকরা ১৭ ভাগের স্থলে ৭ ভাগ হলে তা আরো কমে ২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা হবে।
জানা যায়, পৌরকরের দাবি নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে মতবিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে উভয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের পর বিরোধ মীমাংসায় নির্দিষ্টসংখ্যক প্রতিনিধির সমন্বয়ে পুনরায় সার্ভে করার সিদ্ধান্ত হয়।
