আধুনিক জীবনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব আকাশচুম্বী। বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হিসাবে ফেসবুকের গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তা অকল্পনীয়। ফেসবুক যদি হয় আগুনের শিখা, তবে এই দেশের অনেকেই পাখা গজানো পিপীলিকার মতো ঐ শিখায় ঝাঁপাইয়া পড়িতে দ্বিধা করেন না। ফেসবুকের মধ্যে এত অধিক ফেক নিউজ থাকে যে, অনেকেই ইহাকে ‘ফেসবুক’ না বলিয়া ‘ফেকবুক’ বলিতে চাহেন। ফেসবুকের অতি সামান্য ভাসমান জ্ঞানই অনেকের জ্ঞান আহরণের প্রধান ক্ষেত্র, ফেসবুকের ফেক নিউজের বেসাতিই অনেকের নিকট প্রধান সংবাদসূত্র! এমতাবস্থায় যাহা হইবার তাহাই হইতেছে। তথ্যের বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলার এক ভয়ানক অরাজকতা দেখা যাইতেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলিতে। ইহার ভিতরে সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হইয়াছে, বিশ্বব্যাপী ৫৩ কোটির অধিক ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য পুনরায় ফাঁস হইয়াছে। ইহার মধ্যে ৩৮ লক্ষ বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীও রহিয়াছে। উল্লেখ্য যে, এই তথ্যগুলি ইতিপূর্বেও ফাঁস হইয়াছিল। এইবার তাহা আরো ব্যাপক হারে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ছড়াইয়া পড়া ডেটাসেটের মধ্যে রহিয়াছে ব্যবহারকারীর ফোন নম্বর, জন্মতারিখসহ ব্যক্তিগত নানা তথ্য। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, ফাঁস হওয়া তথ্য হইতে ঐ ব্যবহারকারীরা এখন আরো অধিক ক্ষতির মুখে পড়িতে পারেন।
প্রথম কথা হইল—ফেসবুকে ফেকের অভাব নাই। দ্বিতীয়ত, উহাতে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার বালাই নাই। সুতরাং সহজ প্রশ্ন হইল—মানুষ ফেসবুক কেন ব্যবহার করিবে? এই ক্ষেত্রে এক কথায় বলা যায়, ফেসবুকেরও রহিয়াছে অসংখ্য ইতিবাচক দিক। ইহাতে তুলনা টানা যায় ঔষধের সহিত। প্রায় প্রতিটি ঔষধেরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রহিয়াছে; কিন্তু ঐ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তুলনায় লাভের পাল্লা অনেক অধিক ভারী থাকে বিধায় শরীর খারাপ করিলে সংশ্লিষ্ট ঔষধের উপর আমাদের নির্ভর করিতে হয় বটে। ফেসবুকেরও ইতিবাচক দিকগুলি বর্ণনা করা যাইবে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়িয়া; কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। ফেসবুক ব্যবহারকারী প্রায় সকলেই ‘বিশ্বাস’ করিয়া ফেসবুকে তাহাদের ‘মনের ভান্ডার’ খুলিয়া দিয়া থাকেন; কিন্তু ইহা লইয়া কেহ মাথা ঘামায় না যে, ফেসবুক সেই সকল তথ্য লইয়া ব্যবসা করিতে পারে। মাথা ঘামাইবে কী করিয়া? ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলিবার শর্তাবলির ঢাউস লিস্টের কোথায় কী লেখা রহিয়াছে, কে তাহা খুঁটাইয়া পড়িয়াছেন? অনেকেই মনে করেন, ফেসবুকে তথ্যচুরির ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে বিস্ময়ের কিছু নাই। বাংলায় একটি প্রবাদ রহিয়াছে—শিয়ালের নিকট মুরগি বর্গা দেওয়া। ফেসবুকের নিকট ব্যক্তিগত তথ্য বর্গা দেওয়ার সহিত ঐ প্রবাদের খুব অধিক পার্থক্য নাই।
মুশকিল হইল, মানুষের তথ্যের গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দেয় ফেসবুক। অর্থাত্ শিয়াল হইয়া সে এই ঘোষণা দেয় যে, তাহার নিকট ব্যক্তিগত তথ্য নামের মুরগিখানি নিরাপদে রাখা যাইবে; কিন্তু শেষাবধি সেই শর্ত ফেসবুক গোপনে বরখেলাপ করে। স্পষ্টতই ইহা ফেসবুকের চরম অসততা। আমরা দেখিয়াছি, বিগত কয়েক বত্সর ধরিয়া ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা দিতে না পারায় ফেসবুক বেশ কয়েক বার সমালোচিত হইয়াছে। উল্লেখ্য যে, বিজ্ঞাপনদাতারা কীভাবে ফেসবুকের তথ্য ব্যবহার করিতেছে, সেই ব্যাপারে ব্যবহারকারীদের ভুল তথ্য দেওয়ায় ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন ফেসবুককে ৫০০ কোটি ডলার জরিমানা করিয়াছিল। ফেসবুকের বিশাল মুনাফার বিপরীতে এই জরিমানার অঙ্ক অবশ্য খুবই সামান্য। তবে শাস্তির ঘটনাটি তাত্পর্যপূর্ণ। কারণ, ফেসবুক যে অন্যায় করিতেছে, শাস্তির রায়ের মাধ্যমে তাহা প্রমাণিত হইতেছে।
আমরা মনে করি, সাধারণ মানুষকেও বুঝিতে হইবে, কেবল ফেসবুক নহে, ইন্টারনেটের জগতে প্রদান করা কোনো তথ্যই গোপন থাকে না শেষাবধি। সুতরাং কতটুকু তথ্য প্রকাশযোগ্য—তাহা বুঝিয়া লইতে হইবে সাধারণ ব্যবহারকারীকেই।
