প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনার সংক্রমণ। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধির ধারায় ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যায় নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ার কারণে সরকারি হাসপাতালগুলো ইতিমধ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে। রোগী সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিত্সকেরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘হাসপাতালগুলোর ওপর যে হারে চাপ বাড়ছে, তাতে করোনা ভাইরাসের চিকিত্সাসেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। জনবলের সংকটে ব্যাহত হতে পারে চিকিত্সাসেবা। করোনা রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে অন্য রোগীদের সেবা দিতে পারছি না। তাদের ওপর অবিচার করা হচ্ছে। সুচিকিত্সার অভাবে অনেক সাধারণ রোগী মারা যাচ্ছে।’ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা এখন করোনা নিয়েই বেশি ব্যস্ত।’
সরকারি হাসপাতালে ব্যবস্থাপনায় নানা ঘাটতির কথা তুলে ধরে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা বলেন, অপ্রয়োজনীয় স্থানে জনবল নিয়োগ করে অর্থের অপচয় করা হচ্ছে। অথচ যারা চিকিত্সাসেবা দিয়ে মানুষের জীবন বাঁচাবে, সেই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জনবলের প্রচণ্ড ঘাটতি রয়েছে। সংকট উত্তরণে অবিলম্বে স্পেশাল বিসিএসের মাধ্যমে বেকার ডাক্তারদের নিয়োগের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে করোনা ভাইরাসের টিকা আর দেওয়া হচ্ছে না বলে গতকাল বিভিন্ন মাধ্যমে খবর আসে। তবে এই খবর সঠিক নয়। করোনার টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত থাকছে। এক জন করোনা যোদ্ধা ডাক্তারের ফেসবুক স্ট্যাটাসে সরকারি হাসপাতালগুলোয় করোনা রোগীর প্রচণ্ড চাপ এবং হাসপাতালে জনবল সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। ডা. সাইয়েদা নাজিয়া তার নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘২৪ মার্চের নাইট ডিউটি ছিল মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আমার। কোভিড ডিউটির ভয়ংকরতম রাত ছিল। ফজর পর্যন্ত আমি এবং আমার তিন কলিগ সাততলা থেকে ১২ তলা পর্যন্ত অবিরাম ছুটে বেড়িয়েছি। ওয়ার্ডে পা দিয়েই একটা ডেডবডি। অবিরাম রোগী আসছে শ্বাসকষ্ট নিয়ে। বেশির ভাগ রোগীর ফুসফুস ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ আক্রান্ত। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৭০ থেকে ৮০ পার্সেন্ট। আইসিইউতে অবিরাম কল যাচ্ছে, কিন্তু ১৪ বেডের আইসিইউ খালি হচ্ছে না। রোগীর এটেনডেন্টের অসহায় আর্তনাদে রাতের বাতাস ভারী। তাদের কাকুতি-মিনতি—যত টাকা লাগে ডক্টর একটা আইসিইউ দিন। তাদের কাছে উলটো ক্ষমা চাই; বোঝাতে পারি না ওয়ার্ডে ১৫ লিটারের বেশি অক্সিজেন দেওয়া যায় না, যেখানে পেশেন্টের দরকার ৬০-৭০ লিটার পার মিনিট অক্সিজেন। আমাদের অক্ষমতা, আমাদের অশ্রু কেউ দেখে না। চোখের সামনে স্যাচুরেশন পঞ্চাশে নেমে আসে, এতটা অসহায় আর কখনো লাগেনি নিজেকে। এমনকি ২০১৯-এ ডেঙ্গু মহামারিতে একা ২০০ পেশেন্ট ম্যানেজ করার সময়ও না! রাত ৩টার মধ্যে ২২টা পেশেন্ট ভর্তি! অষ্টম ও নবম তলা থেকে খবর আসে আমরা ফুললি অকুপাইড, কোনো বেড খালি নেই। ভোরের দিকে আবার মৃত্যু। ইমার্জেন্সির সামনে অ্যাম্বুলেন্সের ভিড়। সীমিত জনবল আর লজিস্টিকস নিয়ে আমরা এই করোনা ঝড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি! অসম এই লড়াইয়ে আমরা হারতে চাই না। তাই দুইবার করোনায় আক্রান্ত হয়েও ডিউটিতে ফিরেছি। অনেক সহকর্মী হারিয়েছেন তার আপনজন। ১১ মাসের টানা লড়াইয়ে আমরা বিপর্যস্ত। তাই ডাক্তারকে গালি দেওয়া বন্ধ করে নিজেরা একটু দায়িত্বশীল হন। আইসিইউ বেড বা অক্সিজেন আমরা তৈরি করি না। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন, অকারণে ঘরের বাইরে যাবেন না!’
করোনা রোগীদের সেবায় নিয়োজিত চিকিত্সকেরা বলেন, আমরা বুলেটের সামনে থেকে চিকিত্সাসেবা দিয়ে যাচ্ছি। একটু এদিক-সেদিক হলেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারি। গতকাল পর্যন্ত করোনায় ১৩৩ জন ডাক্তার মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৩৫০ জন ডাক্তার। ২০ জন নার্স করোনায় মারা গেছেন, আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজারেরও বেশি নার্স। অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর মধ্যে ১০ জন মারা গেছেন, ৩ হাজারেরও বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। প্রায় ১০ হাজার ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, জনগণের স্বার্থে লকডাউনের বিকল্প নেই। স্পেশাল বিসিএসের মাধ্যমে বেকার ডাক্তারদের দ্রুত নিয়োগের পক্ষে মত দেন তিনি। অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের টিকা আমরা চালিয়ে যাব। করোনার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া শুরু হবে ৮ এপ্রিল থেকে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, করোনা সংক্রমণের জোন ভাগ করে প্রথমে রেড জোনে লকডাউন দিতে পারত। তবে মানুষকে রক্ষা করতে লকডাউন দিতে হবে। কারণ যখন ব্যাপক হারে সংক্রমিত হবে, তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, ডাক্তাররা ভয়ে আছেন। করোনা রোগীদের চিকিত্সাসেবা দিতে গিয়ে পরিবার নিয়েও তারা আতঙ্কিত। অনেকটা যুদ্ধক্ষেত্র অবস্থা, বুলেটের সামনে সেবা দিচ্ছেন ডাক্তাররা। চিকিত্সাসেবা প্রদানে তারা পিছপা হচ্ছেন না।
গতকাল রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৭ হাজার ৮৭ জনের মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এক দিনে শনাক্ত রোগীর এই সংখ্যা দেশে মহামারি শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ। নতুন রোগীদের নিয়ে দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৬ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৪ জনে। গত এক দিনে করোনায় মারা গেছেন ৫৩ জন। তাদের মধ্যে ৪৫ পুরুষ ও নারী আট জন। এ পর্যন্ত মোট ৯ হাজার ২৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
