‘নগরশ্রেষ্ঠ’ ঢাকার তুলনা ঢাকাই

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২১, ২২:০২

বেখেয়ালে আপনার দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করেছেন তো নির্ঘাত কারো না কারো নাসিকায় আঘাত করেছেন—এমনই ভিড়ভিড়াক্কার ঢাকার রাস্তাঘাট। দৃষ্টিপথও বিশ-পঞ্চাশ বিঘতে আটকে যায়; গায়ে গায়ে ঘেঁষে দরদালান। টানা দুই মিনিট নির্ঝঞ্ঝাটে হাঁটার মতো ফুটপাত নেই। গণপরিবহন বা ব্যক্তিগত গাড়িতে গন্তব্যে কখন পৌঁছাবেন, স্বয়ং নগরপিতারও তা অজানা। একইভাবে এই মহানগরীর যাত্রাপথের হদিস কারো জানা আছে বলে জানা যায় না। যদিও এর ‘গন্তব্য’ নিয়ে নগরবাসী তো বটেই, পুরো দেশবাসীই নিঃসংশয়। ঢাকার ‘ফকফকা’ ভবিষ্যত্ সম্পর্কে বলতে কারো জ্যোতিষশাস্ত্র জানার দরকার পড়ে না। দিনদুনিয়ায় প্রচলিত কোনো সূচকে, মানদণ্ডেই আমাদের প্রিয় এই নগর আর ‘বাসযোগ্য’ অবস্থানে নেই। এবং তার চেয়েও ভয়ের কথা, সার্বিক পরিস্থিতি দিনকে দিন খাদের দিকেই গড়াচ্ছে। শব্দদূষণ, বায়দূষণ এরই মধ্যে ভয়াবহতম অবস্থায়। চারদিকের নদনদীগুলো কেবল নাম দিয়ে চিনতে হয়!

যদিও এই শহর ও এর আশপাশ ঘিরে একরাশ উন্নয়নকাজ চলমান, আরো কিছু রয়েছে পরিকল্পনার টেবিলে। আর স্বপ্ন? ঢাকাকে ঘিরে আমাদের স্বপ্ন রাশি রাশি। যদিও প্রতিমুহূর্তে এই স্বপ্ন ঠোকর খায় রূঢ় বাস্তবতায়। তবু এই শহর প্রতিদিনই আড়ে-বহরে বাড়ছে, হুহু করে। খাল বুজিয়ে, নদী ভরাট করে, জলাশয় হাপিস করে, গাছপালা উজাড় করে, খাস জায়গাজমি দখল করে চারদিকে শুধু দালানকোঠা, আবাসন। খোলা জায়গা নেই, কোনো জলাশয় নেই, খেলার মাঠ নেই। শুধু ঢাকা কেন, দেশের অন্যান্য জেলা-উপজেলা শহরসহ পৌরসভায়ও বসতি গাড়ার ধুম পড়েছে যেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) বলছে, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নগরায়ণের হার অনেক অনেক বেশি। এবং বলা বাহুল্য, এই নগরায়ণ মোটাদাগে অপরিকল্পিত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে নগরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১১ সালে দেশের নগরগুলোতে বাস করত ২৮ শতাংশ মানুষ, ২০২০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে তা ৩৮ শতাংশে। অর্থাত্, এখনই দেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ নগরের বাসিন্দা। এর মধ্যে ‘নগরশ্রেষ্ঠ’ ঢাকায় বসবাসকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি এবং নগরজীবনের দুর্ভোগও এখানে সবচেয়ে বেশি।

দুই থেকে আড়াই কোটি মানুষের ঢাকা বস্তিরও নগরী। নগরের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মানুষের বাস বস্তিতে। ফুটপাতে, রেলস্টেশন ও বাসস্টপে, ওভারব্রিজে, যাত্রীছাউনির নিচে, পার্কের ধারেকাছে, এখানে-ওখানে গোটা একটা জীবন কাটিয়ে দেয় আরো বহু ছিন্নমূল মানুষ। জীবনের অধিকার যেমন সম্মান নিয়ে বাঁচার অধিকার, ‘শহরের অধিকার’ তেমনি শহরে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। কাজের পরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যকর আবাস, বিশ্রামের ব্যবস্থা, গৃহকর্মের পরিবেশ। গরিব মানুষের বসবাসের এলাকাগুলোয়, বহু বস্তিতে পানীয়জল, বিদ্যুত্, গ্যাস, শৌচাগারের মতো ন্যূনতম নাগরিক পরিষেবার ছিঁটেফোঁটাও নেই। অথচ ফ্ল্যাট-বাড়িতে গৃহকর্মের মানুষ, রিকশাওয়ালা, পেপারওয়ালা, বাসচালক, নির্মাণশ্রমিকের উত্স বস্তি। শহরটাকে সাফ-সুতরো করে রাখছে কারা? বস্তিবাসী। ফুটপাতে সস্তার নানা পণ্যের দোকান, ভ্যানে করে ঘরের দোরে শাকসবজি থেকে শুরু করে ফলমূল, মনোহারি পণ্যের জোগান দিচ্ছে তারা। নানাভাবে নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজন মিটিয়ে চলেছেন, শহরটাকে গড়েপিটে তৈরি করে চলেছেন, টেনে নিয়ে চলেছেন, অথচ তাদের ন্যূনতম নাগরিক পরিষেবা, স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান দিতে পারছে না ঢাকা। এর ওপর করোনা পরিস্থিতি তাদের আয়রোজগারে কোপ বসিয়েছে। ছোট চাকুরে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস কর্মী থেকে শুরু করে নানা খাতের শ্রমিক, দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ করোনার আঘাতে ধরাশায়ী। তথাকথিত মানুষ মধ্যবিত্তও টেনেহিঁচড়ে তাদের জীবন আর টেনে নিতে পারছে না।

করোনা পরিস্থিতিতে কাজকর্ম হারিয়ে কিছু মানুষ ঢাকা ছাড়ছে বটে, কিন্তু সব শ্রেণি-পেশার রুটিরুজির ‘কেন্দ্রস্থল’ও ঢাকা। ফলে উপায়ন্তর না থাকায় প্রতিদিনই কাজের সন্ধানে, বেঁচে থাকার তাগিদে ঢাকায় ভিড়ছে আরো বহু মানুষ। ফলে প্রতিনিয়ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, পরিষেবা থেমে থাকছে আগের জায়গাতেই। নানা সময়ে নগরকেন্দ্রিক পরিকল্পনা ও নীতি হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ঢাকার সার্বিক পরিস্থিতি দিনে দিনে আরো খারাপ হচ্ছে। উপরন্তু, ঢাকাকেন্দ্রিক অতিনির্ভরতার কারণে অন্যান্য নগর গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও মাঠে মারা গেছে।

জাতিসংঘের অনুমান, ২০৫১ সালে মোট জনসংখ্যার ৫৮ শতাংশই নগর এলাকায় বাস করবে। স্মার্ট সিটি, গ্রিন সিটি, মেগা সিটি, মেট্রাপেলিস—যে নামেই ডাকি, ঢাকার সেই সময়ের সম্ভাব্য ছবির কথা ভাবলে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে! তখন বেখেয়ালেও আপনার দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করার কোনো জো থাকবে না। এখনই এ দিকটায় দৃষ্টি না দিলে দৃষ্টিপাতও বুঝি ভুলে যেতে হবে তখন!

n লেখক :সাংবাদিক

[email protected]