ইহা কি নিছক দুর্ঘটনা?

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২১, ২২:০১

অর্ধশতাধিক যাত্রী লইয়া গত রবিবার যাত্রীবাহী একটি লঞ্চ শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবিয়া যায়। কার্গো জাহাজের ধাক্কায় লঞ্চটি ডুবিয়া যাইবার সময় অল্প কিছু যাত্রী সাঁতরাইয়া তীরে উঠিতে সক্ষম হইলেও সিংহভাগ যাত্রীর সলিলসমাধি ঘটে। কোস্ট গার্ড, দমকল বাহিনী, নৌ ও সদর থানা পুলিশের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সকল মিলাইয়া উদ্ধার করা হয় ৩৫টি লাশ।

প্রতিটি জীবনই মূল্যবান। এইভাবে অকালে ঝরিয়া যাওয়া প্রাণগুলির জন্য কে দায়ী হইবেন? ইহা কি নিছক দুর্ঘটনা? এই প্রশ্ন তুলিবার যথেষ্ট অবকাশ রহিয়াছে। আমরা এই ক্ষেত্রে স্মরণ করিতে পারি গত বত্সর ২৯ জুনের আরেকটি নৌ দুর্ঘটনা। সেইদিন মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি হইতে যাত্রী লইয়া সদরঘাটের দিকে আসিতেছিল ছোট আকারের লঞ্চ এমএল মর্নিং বার্ড। বুড়িগঙ্গা নদীতে ময়ূর-২ নামের আরেকটি বড় লঞ্চের ধাক্কায় মর্নিং বার্ড ডুবিয়া যায়। সলিলসমাধি হয় ৩৪টি তাজা প্রাণের। ঐ দুর্ঘটনার পর সেই সময় সদরঘাটের একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও দেখিয়া নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী বলিয়াছিলেন যে, ঘটনার যেই ধরন, তাহাতে তাহার মনে হইয়াছে ইহা ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’। বর্তমান দুর্ঘটনাটিও ইহার ব্যতিক্রম নহে। এই লঞ্চডুবির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে অবশ্য সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করিয়াছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। তবে তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান, সুপারিশ এবং পরবর্তীকালে সেই সকল সুপারিশ বাস্তবায়ন লইয়া অনেক কৌতুক কথা প্রচলিত আছে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, গত ২২ বত্সরে সাত শতাধিক ছোট-বড় লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। প্রাণহানি হইয়াছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মানুষের। স্মর্তব্য যে, প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি হইয়াছে। এত বিপুলসংখ্যক তদন্ত কমিটির সুপারিশের কয়েক শতাংশও যদি এতদিনে বাস্তবায়িত হইত, তাহা হইলে হয়তো পরবর্তীকালে আর তদন্ত কমিটি গঠন করিবার মতো পরিস্থিতি সৃষ্ট হইত না। দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, অধিকাংশ তদন্ত প্রতিবেদনই আলোর মুখ দেখে না। কিছু কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশিত হইলেও সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় না। সুতরাং ইহা স্পষ্ট যে, নৌ দুর্ঘটনা ঘটিবার সঙ্গে সঙ্গে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করিলেও উহার ফলাফল কিন্তু শূন্যই থাকিয়া যাইতেছে।

বর্তমান সময়টা দুর্যোগপূর্ণ। নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০০৯ সালে জারিকৃত স্থায়ী আদেশ অনুযায়ী প্রতি বত্সর ১৫ ফেব্রুয়ারি হইতে ৩০ মে অবধি দুর্যোগপূর্ণ সময়কাল হিসাবে ধার্য করা হইয়াছে। এই সময়কালটি কালবৈশাখী মৌসুম হিসাবে চিহ্নিত করা হইয়াছে। কালবৈশাখী মৌসুমে দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বিশেষ নির্দেশও দেওয়া হইয়া থাকে নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগকে। প্রশ্ন হইল, সেই নির্দেশ কি কেবল কাগুজে ব্যাপার মাত্র? দেশে বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার নিবন্ধিত নৌযান ছাড়াও অনিবন্ধিত অসংখ্য নৌযান রহিয়াছে। এই সকল নৌযানে গড়ে কমপক্ষে দুই জন মাস্টার ও দুই জন ইঞ্জিনচালক নিয়োগ করিতে হইলে প্রায় ৫৬ হাজার প্রশিক্ষিত জনবল দরকার। ইহারা যদি সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত হন এবং নিয়ম মানিয়া চলেন, তাহা হইলে নৌ দুর্ঘটনাই ঘটিবার কথা নহে। প্রশিক্ষিত মাস্টার-সুকানি কখনই দায়িত্বে গাফিলতি করিবেন না, ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ-তিন গুণ যাত্রী বহন করিবেন না, নিরাপত্তা আইন অমান্য করিবেন না। গত বত্সর ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় মর্নিং বার্ড ডুবিয়া যাইবার পর তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে নৌ দুর্ঘটনা এড়াইতে ২০ দফা সুপারিশ করিয়াছিলেন। ঐ সুপারিশেই বলা হয়, লঞ্চের সামনে, পিছনে, মাস্টার ব্রিজে, ইঞ্জিন রুমে, ডেকে সিসিটিভি ক্যামেরা বসাইতে হইবে। মাস্টারের দেখিবার সুবিধার জন্য ব্যাক ক্যামেরার ব্যবহার নিশ্চিত করিতে হইবে। এই ব্যবস্থা কতগুলি লঞ্চে বাস্তবায়িত হইয়াছে?

এমন আরো অনেক প্রশ্ন তোলা যায়। যাহারা নৌযানে চড়িবেন, তাহাদেরও সচেতন থাকাটা জরুরি। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই লঞ্চের ব্যাপারে কোনো আপস নহে। একটি মুহূর্তের অসচেতনতাতেই সলিলসমাধি ঘটিয়া যাইতে পারে বহু মানুষের। সুতরাং প্রত্যেকের নিজস্ব সচেতনতাও অত্যন্ত জরুরি।