যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পরিবারের ছয় সদস্যের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২১, ২২:৩৫

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অ্যালেন শহরে বসবাসরত এক বাংলাদেশি পরিবারের ছয় জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। লাশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। যাদের লাশ পাওয়া গেছে তারা হলেন—আলতাফুন নেসা (৭৭), আইরিন ইসলাম (৫৬), তৌহিদুল ইসলাম (৫৪), তানভীর তৌহিদ (২১), ফারবিন তৌহিদ (১৯) ও ফারহান তৌহিদ (১৯)।

পুলিশ বলছে, যাদের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, তারা সবাই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান। ঐ পরিবারের দুই ছেলে তাদের বাবা, মা, বোন ও নানিকে হত্যার      পর আত্মহত্যা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আত্মহত্যাকারী দুই ভাই ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অস্টিনের শিক্ষার্থী ছিল। তারা বিষণ্নতায় ভুগছিল বলে ঘটনার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া নোটে উল্লেখ করেছে। ছোটো ভাই দীর্ঘ নোটে তাদের বিষণ্নতায় ভোগার ইতিহাস, হত্যার পরিকল্পনা ও ঘটনা সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা দিয়েছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়, ঐ পরিবারের এক বন্ধু তাদের ফোন করে পাচ্ছিলেন না। এরপর তারা পুলিশকে খবর দেন। সোমবার ভোরে পুলিশ অ্যালেন শহরের পাইন ব্লাফ ড্রাইভ এলাকার ঐ বাড়িতে গিয়ে ছয় জনের লাশ দেখতে পায়। বন্দুকের গুলিতে ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। বাড়িটি থেকে বন্দুকও উদ্ধার হয়েছে।

পুলিশ বলছে, গত শনিবার এই হত্যাকাণ্ড ও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে তাদের ধারণা। ছোটো ছেলের নোটটিকে পুলিশ ‘হতাশার ধারাবিবরণী’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ঐ নোটে ছোটো ছেলেটি লিখেছে, সে ২০১৬ সাল থেকে চরম বিষণ্নতায় ভুগছিল। এমনকি এর জের ধরে কখনো কখনো নিজেই নিজের হাত-পা কেটে স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করেছে সে।

জানা গেছে, ঐ দুই ভাই তাদের বোনকে নিউ ইয়র্ক থেকে ডেকে নেয় পারিবারিক গেটটুগেদারের জন্য, আর তার নানি গত মাসে বাংলাদেশে ফেরার কথা থাকলেও করোনা মহামারির কারণে ফিরতে পারেননি। নোটে ছোটো ছেলেটি বর্ণনা করেছে কীভাবে তারা বন্দুক সংগ্রহ করেছে। সে লিখেছে, বড় ভাই গিয়েছিল দোকানে। সেখানে গিয়ে বলল, বাড়ির নিরাপত্তার জন্য বন্দুক দরকার। দোকানি কয়েকটি ফরম ধরিয়ে দিলে সেখানে স্বাক্ষর করে তার  ভাই। এরপর হাতে পেল কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি, যা দিয়ে নিজের ও পরিবারের কষ্ট সহজে লাঘব করা যাবে। পুলিশ বলছে, পরিবারকে লজ্জা ও কষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য দুই ভাই সবাইকে হত্যা করে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে বলে নোটে উল্লেখ রয়েছে। পুলিশ এ নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ টেক্সাসের সেক্রেটারি নাহিদা আলী বিবিসিকে বলেন, আকস্মিক এ ঘটনায় টেক্সাসের পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটি হতবাক হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, পরিবারটি ছিল ছিমছাম ও শান্তিপ্রিয়। প্রতিবেশীসহ অন্যদের সহযোগিতার জন্য সুনাম ছিল তাদের। তিনটি সন্তানই খুব মেধাবী ছিল। বিষণ্নতার জন্য দুই ভাই দীর্ঘদিন ধরে চিকিত্সা নিচ্ছিল বলে ছোট ছেলেটি তার নোটে লিখেছে, যদিও পরিবার থেকে এসব কিছু কখনো অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা হয়নি।

পুরান ঢাকার এই পরিবারটি আট বছর ধরে টেক্সাসে বসবাস করছিল এবং তার আগে তারা নিউ ইয়র্কে থাকত। তাদের পরিবারের আরো সদস্য যুক্তরাষ্ট্রে আছে এবং খবর পেয়ে তারা সেখানে রওনা হয়েছেন।

এদিকে এ ঘটনা জানাজানির পর ভোর থেকেই সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অনেকে বাড়িটির সামনে জমায়েত হন।

পাবনার বাড়িতে মাতম

ইত্তেফাকের পাবনা প্রতিনিধি জানান, পাবনার মেয়ে আমেরিকা প্রবাসী আইরিন ইসলাম স্বামী, সন্তান, মাসহ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ায় তার গ্রামের বাড়ি পাবনার শহরতলির দোহারপাড়ায় চলছে মাতম। গতকাল সকালে স্বজনদের মৃত্যুর সংবাদ বাড়িতে পৌঁছানোর পর শোকাবহ এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্বজনেরা জানায়, ছোটবেলা থেকেই ফারহান ও তানভীর মেধাবী। পরিবারেও  নেই তেমন কোনো সংকট। আকস্মিক এই মৃত্যুর খবরে সকাল থেকেই বাড়িতে ভিড় জমান স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

নিহত আলতাফুন নেসার বড় ছেলে ও আইরিন ইসলামের ভাই আরিফুর রহমান আলফা বলেন, ‘আমার বোন কেবল তার পরিবারই নয়, আমাদেরও সবকিছু দেখভাল করত। তার নিজের সংসারে কখনোই অশান্তি ছিল না। ছেলেমেয়েরাও প্রতিভাবান, মেধাবী ও ভদ্র। তারা বাবা-মায়ের পাশাপাশি সেখানে বেড়াতে যাওয়া তাদের নানিরও (আমার মা) যত্ন নিত। এমন ছেলেরা বাড়ির সবাইকে হত্যা করেছে, কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না!’