মৌসুমি

কুরচি আমাদের বনকুসুম

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২১, ২১:২৯

ফাল্গুনের রেশ শেষ না হতেই তেড়েফুঁড়ে ঝাপিয়ে আসে চৈত্র। দাবদাহের সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া সবকিছু এলোমেলো করে দিচ্ছে। আকাশের মুখ ধুলোয় অন্ধকার। তবু কোথাও বৃষ্টির ছিটেফোঁটা নেই।

এখন তো আর হবু রাজা আর গবু মন্ত্রী নেই। নেই বা বলি কী করে? তাদের চ্যালা-পুঁটিদের বংশধররা তো আছে। সেই যুগে ধুলো মারতে ‘ঝাঁটা সাড়ে সতেরো লক্ষ’ কেনা হয়েছিল। এখন ১২ সিটি করপোরেশনের জন্য ৩০ কোটি টাকায় কেনা হয়েছে মাত্র ২০টি ‘রোড সুইপার’ মানে ধুলো মারা যন্ত্র। মাস পাঁচেক আগে ঘটা করে হস্তান্তর। এখন তা তেমন কাজে আসছে না। পানি না ছিটোলে ধুলো ওড়ে। ছিটোলে পরিষ্কার হয় না। উলটো কাদা তৈরি হয়। বেতাল অবস্থা। ‘রোড সুইপার’ এই যন্ত্রগুলো আর কোথায় আছে কে জানে; তবে জানামতে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নগর ভবন প্রঙ্গণে দুটো শোভা পাচ্ছে জানুয়ারি থেকেই। তা পাক, এই করোনাকালে সবাই যখন জুতো আর নাক-মুখ ঢাকা মাস্ক পরে আছে তখন সামান্য ধুলো নিয়ে এত মাথা গরম করার কী আছে!

চৈত্রের হাওয়া এদিকের ধুলো উড়িয়ে ওদিকে ধুলো-ঘুর্ণি তুলছে আর ওদিকের ঝরা পাতার  জঙ্গল ঝেটিয়ে এদিকে পাপড়ভাঁজার পাহাড় গড়ছে। মাঝপথে পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুন দুমড়ে-মুচড়ে একাকার। কী অবস্থা!

এদিকে আমাদের চাতক চোখ ঘুরে বেড়ায় আকাশের আঙিনায় জলকণার খোঁজে। তারপর ক্লান্ত চোখ ফেরে মর্তে,  সে চোখে চমক লাগায় বরফ-সাদা ফুলে ভরা গাছগুলো। সত্যিই মনে হচ্ছে ঊর্ধমুখী গাছগুলোর ছড়ানো ডালপালার পরতে পরতে বরফ জমে আছে। ওদের নাম কুরচি।

এ দৃশ্য আমি দেখছি কুমুদিনী পল্লির চলতি পথে। মির্জাপুরে কুমুদিনী পল্লি এখন সেজেছে কুরচি ফুলে। মঞ্জুরিতে সংখ্যায় কম কিন্তু বিক্ষিপ্ত মঞ্জুরির সংখ্যা অজস্র। ছোট ছোট থোকায় থোকায় ফুল ফুটে আছে—ওরা থাকবে শরত্ পর্যন্ত। মিষ্টি সুগন্ধে মন ভোলাবে পথিকের।

জানি তো ‘এপ্রিল নিষ্ঠুরতম মাস, সে মৃত মাটির বুকে লাইলাক ফোটায়’। আর আমাদের ফুটেছে কাঠফাটা চৈত্রে কুরচি। বড় বড় গাছ ফুলে ফুলে ভরা। মুক্তাঙ্গনে যেন আলোর মেলা।

প্রকৃতিপুত্র দ্বিজেন শর্মার কাছে জেনেছি কুরচি আমাদের বনকুসুম। অযত্নে জন্মে, শুভ্র ফুল ফুটিয়ে সুগন্ধ বিলায়। ওষুধ জুগিয়ে মানুষকে বাঁচায়। রবীন্দ্রনাথই তো লিখেছিলেন বিরহী তরু একদিন সমুদ্রের বার্তা পেয়ে এক বসন্তে উজ্জীবিত হয়ে যাত্রা করবে প্রাণতীর্থে, জয় করবে মৃত্যুকে।

বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া এই ফুলটিকে পুনরুদ্ধার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

কুষ্টিয়ায় কবির আসা-যাওয়া ছিল নিয়মিত। তাঁর চোখ গিয়ে পড়েছিল সেইখানে—কুষ্টিয়া স্টেশনের পেছনের দেয়াল ঘেঁষে যে কুরচিগাছ হাটবাজারের ধুলোবালি, রেললাইনের হট্টগোল, গরুর গাড়ির ভিড় সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে বসন্তকে স্বাগত জানাচ্ছে অজস্র ফুল ফুটিয়ে। কবিতার খাতায় লিখলেন তারই জন্যে অনুপম শুভেচ্ছা-বাণী—

সূর্যের আলোর ভাষা আমি কবি কিছু কিছু চিনি

কুরচি পড়েছ ধরা, তুমিই রবির আদরিনী। 

দেখতে যেমন রূপবতী, গুণেও সরস্বতী।

মহাকবি কালিদাসের মেঘদূত মহাকাব্যে পাই—যক্ষ তার প্রিয়তমাকে বর্ষার মঙ্গল বার্তা পাঠাতে দু হাত ভরে মেঘমালাকে দিয়েছিল স্নিগ্ধ সাদা কুরচি ফুল।

এ এক স্বর্গীয় ফুল। দেখে দেখে মন ভরে না। ডেকে দেখাই সবাইকে। মনে হয় শত অমঙ্গলের জঙ্গল সরিয়ে কুরচি বয়ে এনেছে আমাদের জন্যে মঙ্গল বার্তা।