সম্পর্ক ও অপ্রত্যাশিত শূন্যস্থান

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২১, ২১:৩৩

মানব সৃষ্টির প্রাচুর্যে  ‘সম্পর্ক’ একটি প্রাকৃতিক বিষয় যা কেউ ব্যক্তিগতভাবে নিজের পছন্দের প্রেক্ষিতে নির্বাচন করতে পারে না। সম্পর্কের বড় এবং ছোট হওয়ার ধারাবাহিকতায় ছোটরা বড়দের মান্য করবে, কথা শুনবে, বড়দের সিদ্ধান্তগুলো নিজ হিতার্থে মেনে নেবে, সদা কৃতজ্ঞ ও সম্মানসূচক আচরণ করবে—এটা বিধিলিপির মতো প্রত্যাশিত মনে করা হলেও বিষয়টি বাস্তবিকই কতটা সম্ভব তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার প্রয়োজন আবশ্যক। আবার বড়দের প্রতিও স্নেহ, মমতা, আবদার-আহ্লাদপূর্ণ ছোটদের রয়েছে কিছু প্রত্যাশা, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোণঠাসা পরিস্থিতিতে পড়ে নিরাশা সৃষ্টি করে। ফলে সময়ের সঙ্গে বড়-ছোট সম্পর্কে তৈরি হয় এক অপ্রত্যাশিত শূন্য স্থান। যখন ছোট্ট শিশুর মুখে বড়দের মতো করে বলা কথার ফুলঝুড়ি শুনে আমরা মনে মনে হাসি, হাততালি দেই, সাবাসি না হোক অন্তত আনন্দ-বিনোদনের উপাদান হিসেবে দৃষ্টিগোচর করে থাকি সেটা নিতান্তই দূরদর্শিতার অভাবে শিশুর জন্য ক্ষতি ছাড়া কিছুই নয়। কারণ সময়ের সঙ্গে শিশু মনে উল্লিখিত আচরণসমূহ ‘হাসি-তামাশার উপাদান’—এই ধারণা স্থায়ী হয়ে রয়ে যায়। সে ভাবতে শেখে তার আচরণে সবাই আনন্দ পাচ্ছে, এতে দোষ বা ভুল কিছু নেই। অথচ একই শিশু কিছুটা বড় হওয়ার পর সেই একই আচরণের জন্য উচ্ছৃঙ্খল উপাধি পেয়ে থাকে। মূলত কার আচরণে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন প্রয়োজন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সম্পর্কের নিজস্ব কিছু প্রতিষ্ঠিত স্থান, গুরুত্ব ও মর্যাদা রয়েছে। ক্রমাগত মানবিক উন্নয়নে পরিকল্পিত সময় দেওয়ার পরিবর্তে আমরা জীবনকে করে তুলি প্রতিযোগিতা ও তুলনামূলক সাফল্যের এক ধারাবাহিক যাত্রার মতো। ছোট থেকে প্রতিযোগী পরিবেশে ঠেলে দিয়ে মানবিক গুণাবলি বিকশিত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে ছোটদের জন্য তৈরি করা হয় মানসিকভাবে বিক্ষিপ্ত পরিবেশ। ভালো করতে হবে, বড় হতে হবে, আরো বেশি দক্ষ হতে হবে কিংবা অপরের তুলনায় বেশি সফল হতে হবে বিষয়সমূহের মধ্যে ছোটদের জীবনকে আমরা বদ্ধ করে রাখি। যে বয়সে ছোটদের উত্ফুল্লতার সঙ্গে এক সাধারণ জীবন সম্পর্কে ধারণা থাকার কথা সেই বয়সে তারা হয়ে ওঠে গম্ভির প্রকৃতির। 

শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় বিভোর থেকে থেকে মৌলিক মানবীয় গুণাবলি বিকশিত তো হয়ই না বরং সময়ের সঙ্গে আচরণে আসে পরিবর্তন। মিষ্টি মিষ্টি কথায় বিভোর করা সেই ছোটরা বড় হতে থাকে। বিরক্তি, নিজস্ব মতবাদের বিরুদ্ধে বড়দের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর সুফল-কুফল সম্পর্কে বিবেচনাসহ নানান বিষয়ে মতপার্থক্য ক্রমে স্পষ্ট হতে থাকে। অভিভাবকত্বের দোহাই দিয়ে কখনো বড়দের অতিরিক্ত কঠোরতা ও স্বৈরাচারী ব্যবহার হিতে বিপরীত ফলাফল বয়ে আনে। ছোটদের পছন্দ-অপছন্দের তোয়াক্কা না করে সবকিছুতে ‘না’ বলার প্রবণতা আচরণে বিরক্তি এনে দেয়। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছোটরাও বড়দের সিদ্ধান্তে ‘না’ বলা শিখে ফেলে। আমরা যদি ছোটদের সত্যিকার অর্থে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই তাহলে সবার আগে তাদের মানসিক দিক পর্যবেক্ষণ করতে হবে। খারাপ কোনো কিছুর প্রভাব থেকে বের করতে অবশ্যই তার জন্য আগের থেকে উত্তম কোনো বিকল্প খুঁজে নিতে হবে, যা তার জন্য অধিকতর উপযোগী। 

সম্পর্কে বড়-ছোট ধারা তো প্রকৃতির তৈরি কিন্তু সম্মানবোধ তৈরি প্রাকৃতিক নয় বরং অর্জনভিত্তিক। দূরদর্শিতার সঙ্গে দায়িত্বশীল বড় যারা থাকেন তারা ছোটদের সঙ্গে সমঝোতা করবে, পারস্পরিক সুবিধা-অসুবিধা, সামর্থ্য-অসামর্থ্য, দক্ষতা-দুর্বলতাকে বিবেচনায় রেখে সঠিক দিশায় পরিচালনা করার পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক পরিবর্তনে সমানভাবে সচেষ্ট হতে হবে। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন, ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্নের বীজ বপন, অতি যত্নে সে বীজ বেড়ে ওঠায় সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা সমানভাবে গুরুত্বের দাবি রাখে।

ছোটদের মনস্তাত্ত্বিক গঠন বুঝে বড়দের নিয়ম নির্ধারণ, সঠিক পথ প্রদর্শন, একই সঙ্গে তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।  একজন ভালো মানুষ গড়ার পরিকল্পনাকে সামনে রেখে শিশুর আচরণের গতিবিধি পর্যবেক্ষণপূর্বক ছোটদের পাশাপাশি দায়িত্বে থাকা সম্পর্কে বড়দের আচরণেও বিস্তর পরিবর্তন আনা জরুরি। আপনার আমার দায়িত্বে থাকা বয়সে ছোট যেসব সদস্য পরিবার কিংবা কাছের সম্পর্কে রয়েছে তাদের আচরণে দোষারোপ না করে পর্যাপ্ত সময়ের সঙ্গে বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণভাবে নেওয়া ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী শিশুর মানসিক বিকাশে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। মানবিক গুণাবলি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া, দেশ কাল ও পরিবেশবিষয়ক যথাযথ আলোচনা, পর্যাপ্ত গুণগত সময় কাটানোর ব্যবস্থা, সর্বদা ভালো আচরণের মাধ্যমে ছোটদেরকে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া, তাদের ভালো-মন্দের সম্যক ধারণাসহ ধর্মীয় শিক্ষাদানের মাধ্যমে সক্রিয় জীবনযাপনে সাহায্য করতে হবে। বন্ধুসুলভ আচরণ, ছোটদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া, কোনো বিষয়ের ভালো-খারাপ প্রসঙ্গে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ ছোটদের প্রতিও সম্মানসূচক আচরণ করা বাঞ্ছনীয়।  আমরা অন্যের কাছে যে ব্যবহার আশা করি তা নিজ কর্মপন্থার মাধ্যমে বাস্তবিক উদাহরণ সরূপ উপস্থাপন করে শেখাতে হবে তবেই ছোটরা কথা শোনে না, সম্মান করে না, কৃতজ্ঞ নয় এরূপ বড় বড় সামাজিক সমস্যার সহজে সমাধান সম্ভব। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সঠিক পরিবর্তন ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে সম্পর্কে সৌন্দর্য ও সম্মান বৃদ্ধির  অধিক ফলপ্রসূ ও দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা রয়েছে।

n লেখক :শিক্ষার্থী,  বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।