চলে গেলেন স্বাধীন বাংলা বেতারের কণ্ঠযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশী

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২১, ২২:৩০

দেশের লোকগানের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা শিল্পী ইন্দ্রমোহন রাজবংশী আর নেই। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গতকাল বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

গতকাল সকাল ১০টা ২০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানান হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুলফিকার আহমেদ আমিন। তিনি জানান, করোনা ভাইরাসের সঙ্গে উচ্চরক্তচাপে ভুগছিলেন ইন্দ্রমোহন রাজবংশী। সোমবার হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। ইন্দ্রমোহন রাজবংশী দুই সন্তানের জনক। ছেলে দীপংকর রাজবংশী থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়, মেয়ে সংগীতা রাজবংশী থাকেন জাপানে। তার স্ত্রী দীপ্তি রাজবংশীও বর্তমানে অসুস্থ।

ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর মৃত্যুতে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনসহ দেশের বিভিন্ন মহলে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ প্রমুখ।

গত ১ এপ্রিল বুকে ব্যথা অনুভব করলে ইন্দ্রমোহন রাজবংশীকে দ্রুত মহাখালী মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নেয় তার পরিবার। সেখানে করোনার পরীক্ষা করানো হলে রিপোর্ট পজিটিভ আসে। ফুসফুসে ইনফেকশন ধরা পড়ে। পরে মালিবাগের আরেকটি হাসপাতাল ঘুরে এই শিল্পীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউতে নিয়ে আসা হয়। সেখানেই চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আরেক শিল্পী ফকির আলমগীর বলেন, ‘অনেক স্মৃতি রয়েছে ইন্দ্রদার সঙ্গে। একজন গুণী সংগীত ব্যক্তিত্বকে হারালাম আমরা। করোনায় আক্রান্তের কারণে সর্বস্তরের জনতার শ্রদ্ধার জন্য তাকে শহিদ মিনারে নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান শিল্পী ফকির আলমগীর।

ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর ছোট ভাই অনঙ্গমোহন রাজবংশী জানান, হাসপাতাল থেকে একাত্তরের এই কণ্ঠযোদ্ধাকে বুধবার বিকাল ৪টায় রাজারবাগ কালীমন্দির মহাশ্মশানে আনা হয়। সেখানে বিকালে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। তারপর সেখানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর জন্ম রাজধানী ঢাকায়। তার পরিবারের পাঁচ পুরুষ সংগীতের সঙ্গে জড়িত। সংগীত কলেজে লোকসংগীত বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ লোকসংস্কৃতি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৬৭ সালে ‘চেনা অচেনা’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শুরু করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা দিতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে যোগ দেন। ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, জারি, সারি, মুর্শিদি ইত্যাদি গানের পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হিসেবেও সুখ্যাতি রয়েছে তার। দেশের সংগীতাঙ্গনে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৮ সালে সংগীত বিভাগে একুশে পদক লাভ করেন খ্যাতিমান এই শিল্পী। গান গাওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকগান সংগ্রহ করতেন তিনি। দেশের সহস্রাধিক কবির লেখা কয়েক লাখ গান সংগ্রহ করেছেন তিনি।

জেপির শোক

জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি ও দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম একুশে পদকপ্রাপ্ত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা, লোকসংগীতশিল্পী ও গবেষক ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর পরলোকগমনে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। গতকাল এক শোকবার্তায় জেপির নেতৃদ্বয় বলেন, তিনি আমাদের লোকসংগীত জগতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী ছিলেন। আমরা তার আত্মার শান্তি কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।