ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে নেতাদের বাগ্যুদ্ধ আর সহিংসতায় উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। টানা তৃতীয় বার ক্ষমতায় আসার জন্য লড়ছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। আর এক্ষেত্রে তার দলের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি—বিজেপি, যাদের কিছুদিন আগেও পশ্চিমবঙ্গে শক্ত কোনো ভিত ছিল না। এখনো বিজেপি তাদের মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। যে কারণে মমতা ব্যানার্জিকে ঠেকাতে মাঠে মূল নায়কের ভূমিকা পালন করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই। আর তার সঙ্গে রয়েছেন বিজেপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ভারতে টানা দুই বার বিজেপির ক্ষমতায় আসার জন্য এই মোদি-অমিত জুটিকেই কৃতিত্ব দেওয়া হয়। এবার পশ্চিমবঙ্গে আট দফায় ভোটগ্রহণ হবে। ইতিমধ্যে তিন দফায় ৯১টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। আগামী ২ মে ভোট গণনার পর ফল ঘোষণা করা হবে।
একসময় পশ্চিমবঙ্গ ছিল বামদের ঘাঁটি। সেই বামদের হটিয়ে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। সর্বশেষ ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ২১১টি বিধানসভা আসনে জয়লাভ করে। ঐ নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস অপ্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে সামনে আসে। অন্যদিকে ২০১১ সালের নির্বাচনে বিজেপি একটি আসনও পায়নি। ২০১৬ সালে তারা বিধানসভায় তিনটি আসনে জয়লাভ করে। কিন্তু ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি আসনের মধ্যে ১৮টি জয়লাভ করে। তারা মোট ভোটের ৪০ দশমিক ৬৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এই সফলতা বিজেপিকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। তারা এবারের নির্বাচনে তাই সর্বশক্তি দিয়ে লড়ছে। একই সঙ্গে আরো তিনটি রাজ্য ও একটি ইউনিয়ন টেরিটরিতে নির্বাচন হলেও বিজেপির টার্গেট পশ্চিমবঙ্গই। ইতিমধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ কয়েক জন প্রভাবশালী নেতা দলত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। তারা এবার বিজেপির প্রার্থী হয়ে লড়ছেন। অন্যদিকে প্রায় প্রতিদিনই বিজেপির শীর্ষ নেতারা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা পশ্চিমবঙ্গে আসছেন।
পশ্চিমবঙ্গে যেখানে তৃণমূলের হয়ে একা লড়ছেন মমতা ব্যানার্জি, সেখানে তাকে ঠেকাতে মাঠে নেমে পড়েছে গোটা বিজেপি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সব মিলিয়ে ৪০ দিনে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ নির্বাচনি সভা করবেন বলে জানা গেছে। আগামী বেশ কয়েকটি ধাপের নির্বাচনের দিনই পশ্চিমবঙ্গে প্রচারণা চালাবেন তিনি। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডাও পশ্চিমবঙ্গ চষে বেড়াচ্ছেন। সব মিলিয়ে বিজেপি শীর্ষ নেতারা ১২০টির বেশি নির্বাচনি সভা করবেন। আর বিজেপিকে ঠেকাতে পালটা দিনে তিন থেকে চারটি করে জনসভা করছেন মমতাও। এসব সভায় নেতাদের বক্তব্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা ?বাড়ছে। বাগ্যুদ্ধ কখনো কখনো চলে যাচ্ছে ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে। মমতা ব্যানার্জি নিজেকে বাংলার মেয়ে দাবি করে ভোট চাইছেন। তৃণমূলের দাবি বিজেপি বহিরাগত। অন্যদিকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলছে বিজেপি। মমতা ব্যানার্জি ও তার ভাতিজা অভিষেক ব্যানার্জিই তাদের মূল টার্গেট। বিজেপি ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গ সোনার বাংলা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
তাল মিলিয়ে বাড়ছে সহিংসতাও। ইতিমধ্যে তিন জন নিহত হয়েছেন। বেশ কয়েক জন প্রার্থী হামলার শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল বুধবার কোচবিহারের শীতলকুচিতে জনসভা করে ফেরার পথে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের গাড়িতে হামলার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। বোমা ও পাথর ছোড়া হয় বলে অভিযোগ করেছে তারা। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যদিকে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মগরাহাটে তৃণমূল প্রার্থী গিয়াসুদ্দিন মোল্লার ওপর হামলা হয়েছে। বিজেপি হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ তৃণমূলের।
ভোটের সময় পুলিশ বিজেপি হয়ে যায় :মমতা
গতকাল বুধবার কোচবিহারে এক জনসভায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি অভিযোগ করে বলেছেন, ভোট এলেই পুলিশ বিজেপির হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোট দিতে বাধা দিলে তাদের ঘেরাও করুন।? ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও করেছেন মমতা। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী জনগণকে ভোট দিতে বাধা দিতে পারে না। তাদের উচিত জনগণকে ভোটদানে সহযোগিতা করা। কেন্দ্রীয় বাহিনী গন্ডগোল করার চেষ্টা করলে মহিলারা যেন তাদের ঘেরাও করেন। এক দল ঘেরাও করে রাখবেন, অন্য দল ভোট দিতে যাবেন। ভোট নষ্ট করবেন না।
মমতা বলেন, ভোটের পর কিছু গাদ্দার ?দল ছাড়তে পারে। আমাদের ২০০ আসন পেতে হবে। না হলে বিজেপি টাকা দিয়ে ঐসব গাদ্দারদের কিনে নেবে।? এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে বিধি ভঙ্গের অভিযোগ জানিয়েছে বিজেপি।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একই দিন হুগলির সিঙ্গুরে এক রোড শো-তে বলেন, বোঝা-ই যাচ্ছে, তিনি (মমতা) হারছেন। ?পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসে ১০ বছরে কিছুই করেননি মমতা। ?সিঙ্গুরে কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর ১০ বছরে সেখানে কোনো উন্নয়ন করেননি। পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়ন এবং বেকারদের কর্মসংস্থানের বিষয়ে বিজেপির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। তারই ভিত্তিতে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হবে।?
মমতাকে শোকজ
গত ৩ এপ্রিল হুগলির তারকেশ্বরে একটি নির্বাচনি প্রচারণা সভায় মমতা মুসলিম ভোটারদের এক হওয়ার আহ্বান জানান। তার এই বক্তব্যের জন্য কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কেন তিনি এমন বক্তব্য দিয়েছেন, তা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জানাতে বলা হয়েছে। মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে অভিযোগটি দেয় মুক্তার আব্বাস নাকভির নেতৃত্বে বিজেপির একটি প্রতিনিধিদল।
নির্বাচন কমিশনের নোটিশে বলা হয়েছে, ঐ দিন মমতা বলেছিলেন, ?‘আমার সংখ্যালঘু (?পড়তে হবে মুসলিম)? ভাইবোনদের বলছি, ?আপনাদের ভোট ভাগ হতে দেবেন না?।’ এছাড়াও আরো বেশকিছু মন্তব্য করা হয়েছে—যা সাম্প্রদায়িক সংঘাতের কারণ হতে পারে।
