করোনা ভাইরাসের প্রথম ঢেউয়ে গত বছরের এপ্রিল থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদেশ থেকে মোট ৪ লাখ ৮ হাজার জন কর্মী দেশে ফেরত এসেছিলেন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী ইমরান আহমদ এ বছরের ২০ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে এই তথ্য জানান। যদিও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসেবে—করোনায় কর্মহীন হয়ে দেশে ফিরেছেন আরো বেশি প্রবাসী শ্রমিক। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় বিদেশে শ্রমবাজার আবারও সংকটে পড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি-বায়রার সাবেক সভাপতি ও ঢাকা-২০ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদ গতকাল সোমবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘করোনার সংক্রমণকাল দীর্ঘ হলে জনশক্তি রপ্তানি খাত বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে এই খাতের ব্যবসায়ীরা নতুন করে চিন্তিত। গত বছরের মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত বলতে গেলে এই খাতের ব্যবসা গর্তে পড়ে আছে।’
করোনা ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেওয়ায় গত বছর বেশির ভাগ দেশই ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করে। ফলে প্রবাসে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক করোনার প্রথম ঢেউয়ে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যেই ২ লাখ অভিবাসী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন।
বায়রার একাধিক সদস্য ইত্তেফাককে জানান, গত বছর লকডাউনের পর ফিরে আসা শ্রমিকদের অনেকে এখনো বিদেশের কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি। অবশ্য সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা শ্রমিকদের বেশির ভাগই ফিরে গেছেন। অভিবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দুটি উপায়ে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে প্রবাসীদের বেসরকারি সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামুরু)। অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা নিয়ে ২০১৬ সালের যে আন্তর্জাতিক বিধিমালা রয়েছে, সেখানে বলা আছে—যে কোনো দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে অভিবাসী শ্রমিকরা যেই দেশে অবস্থান করবেন, তাদের দায়িত্ব সে দেশের ওপরই বর্তায়। অভিবাসী গ্রহণকারী দেশগুলো সেই বিধিমালারও তোয়াক্কা করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
জনশক্তি রপ্তানির লক্ষ্যে নতুন নতুন শ্রমবাজারও সন্ধান করছে সরকার। সরকারের সেই চেষ্টার সঙ্গে সমন্বয় রেখে এই খাতের ব্যবসায়ীরাও কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে নতুন বাজার সৃষ্টির উদ্যোগ নেন। এরই অংশ হিসেবে সম্প্র্রতি জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয় ইউরোপের দেশ পোল্যান্ডে। তবে একটি ঘটনায় সেই সুযোগ আপাতত থেমে গেছে। এ বিষয়ে গত ২৪ মার্চ নথিপত্রসহ অভিযোগ যায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোসহ (বিএমইটি) সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত ঐ অভিযোগে দেখা যায়, বায়রার সদস্য ও ‘মাস-বাংলা ওভারসিজ’-এর মালিক জামিল হোসাইন দাবি করেছেন—ইউরোপের দেশ পোল্যান্ডে তিনি জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ পান। পোল্যান্ডের একটি কোম্পানি থেকে ২০১৯ সালের নভেম্বরে তিনি কিছু ওয়ার্কপারমিট ভিসা পান। কিন্তু পোল্যান্ডে বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় গত বছরের জানুয়ারিতে ১৫ জন বাংলাদেশি প্রার্থীকে তার এজেন্সি থেকে নয়াদিল্লির পোল্যান্ড দূতাবাসে পাঠানো হয়। ভারতে অবস্থানকালে ঐ ১৫ জন বাংলাদেশি স্থানীয় আইন অমান্য করায় রিপোর্ট যায় পোল্যান্ড দূতাবাসে। যার কারেণ পোল্যান্ডের ‘এম গ্রুপ প্লাস’ কোম্পানি ঐ ১৫ জনের ভিসা সাময়িকভাবে বাতিল করে দেয়, যদিও তাদের ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ ছিল গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
অভিযোগে জামিল হোসাইন উল্লেখ করেন, ঐ ১৫ বাংলাদেশির পোল্যান্ডের ভিসা বাতিলের পর মানব পাচারের মামলায় তাকে এ বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার করা হয়। তার অভিযোগ, তার বনানী অফিসের বাড়ির মালিকের সঙ্গে ঝামেলাকে কেন্দ্র করে তাকে ফাঁসানো হয়েছে। পুরো বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তিনি। মামলায় বলা হয়েছে, ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট তৈরি করে পোল্যান্ডে মানব পাচারের চেষ্টা করছিলেন জামিল হোসাইন। এ ব্যাপারে জামিল ইত্তেফাককে বলেন, পারমিট ভুয়া ছিল না। আমার কাছে সব প্রমাণপত্র রয়েছে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন ‘বায়রা’ বর্তমানে চলছে প্রশাসক দিয়ে। আগামী ২২ মে বায়রার নির্বাচন হওয়ার কথা। বায়রাতেও অভিযোগ করেছেন জামিল হোসাইন। বায়রাতে প্রশাসক নিয়োগের আগে সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী বেনজীর আহমেদ ইত্তেফাককে জানান, মাস-বাংলা ওভারসিজের ঘটনাটি তিনি শুনেছেন। তবে যেহেতু বিষয়টি বিচারাধীন তাই এ বিষয়ে এখন বিস্তারিত বলা সমীচীন হবে না। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পোল্যান্ডে জনশক্তি রপ্তানির ঘটনাটি তদন্ত করা হবে।
