লেবু কচলালে তিতা হয়!

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২১, ২২:০০

লেবু বাঙালির খুবই প্রিয়। খাবার হিসেবে সবার কাছে হয়তো প্রিয় নয়, কিন্তু লেবু কচলাতে ভালোবাসে না, এদেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবে লেবু শুধু কচলাতেই ভালো লাগে না, লেবুর ঘ্রাণও অত্যন্ত সুন্দর। আসলে লেবু এক আজব ফল। এটি ‘সাইট্রাস লেমন’ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। এর যেমন জাতের কোনো শেষ নেই, গুণেরও কোনো শেষ নেই। এর কদর মূলত রসের জন্যই, যদিও এর শাঁস ও খোসাও ব্যবহূত হয় প্রধানত রান্না ও বেকারির কাজে। লেবুর রসে প্রায় ৫ শতাংশ সাইট্রিক অ্যাসিড থাকে যার কারণে এর স্বাদ টক হয়। লেবুর পাতাও অনেকের প্রিয়। খাবারে সুঘ্রাণ আনার জন্য অনেকে তরকারিতে লেবু দিয়ে থাকেন।

একসময় লেবু গাছেই পাকত। অভিজাত ব্যক্তিরা ছাড়া কেউ লেবু তেমন একটা পাতে তুলত না। গ্রীষ্মকালে লেবুর শরবত বা ডালের সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে খাওয়া ছাড়া এ জিনিসের তেমন কোনো কদর ছিল না। কিন্তু এখন লেবুর দিন ফিরেছে। রসনা বিলাসের উপকরণ হিসেবে, ঔষধি গুণসম্পন্ন উপকারী ফল হিসেবে, রূপচর্চায়, বিভিন্ন তৈজসপত্র চকচকে করাসহ নানা কাজে লেবু এখন অত্যন্ত আকাঙ্ক্ষিত এক ফল।

আমাদের দেশে বুদ্ধিজীবীদের যেমন নানা ঘরানা ও প্রজাতি রয়েছে, ঠিক তেমন লেবুরও রয়েছে নানা প্রজাতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সাইট্রাস প্রজাতির প্রায় ৫০ ধরনের লেবু রয়েছে। কমলা লেবু, বাতাবি লেবু, পাতি লেবু, টক লেবু, রক্ত লেবু, শরবতি লেবু, জাম্বুরা, সাইট্রন লেবু, মান্দারিন লেবু, পারসিয়ান লেবু—সবই এই সাইট্রাস বর্গের অন্তর্গত। আমেরিকা মহাদেশ থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপেও দেখা মেলে লেবুর। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া এই লেবুর উত্পত্তি নিয়ে গবেষকরা এতদিন অস্ট্রেলিয়া ও পাপুয়া নিউগিনির কথা বলে এলেও সম্প্র্রতি লেবুর ডিএনএ পরীক্ষার পর বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিমালয়ের পাদদেশের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলেই নাকি উত্পত্তি হয়েছিল লেবুর। নেচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ৮০ লাখ বছর আগে হিমালয়ের পার্শ্ববর্তী আসামের পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চল এবং চীনের ইউনান প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে লেবুর কিছু প্রজাতি জন্মাত। ৬০-৭০ লাখ বছর আগে হিমালয় অঞ্চলে দুর্বল মৌসুমি বায়ু এবং শুষ্ক আবহাওয়া থাকায় হিমালয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে লেবুগাছ জন্মাতে পারত।

এই অঞ্চলে জন্মানো সেই লেবুর বেশির ভাগই ছিল টক স্বাদের। মূলত এশিয়া অঞ্চল থেকেই টক লেবু ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে। অস্ট্রেলিয়াতে লেবুর উত্পত্তি হয় ৪০ লাখ বছর পূর্বে। নেচার পত্রিকার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কয়েক লাখ বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে লেবু আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সাইট্রাস ফলের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে মার্কিন ও স্পেনের একদল গবেষক পৃথিবীর ৫০টিরও বেশি প্রজাতির লেবুর জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের ওপর গবেষণা করেন। বিভিন্ন প্রজাতির লেবুর জেনেটিক ম্যাপ থেকে বিজ্ঞানীরা লেবুগাছের গুণাগুণ, সহ্যক্ষমতা, রোগপ্রতিরোধক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পান। গবেষকরা যেভাবে লেবুর ওপর ভর করেছেন, তাতে করে ভবিষ্যতে হয়তো এমন প্রজাতির লেবুগাছ উদ্ভাবনে সক্ষম হবেন যেটি একই সঙ্গে স্বাদু, ঔষধি গুণাগুণ এবং রোগপ্রতিরোধ-ক্ষমতাসম্পন্ন হবে।

লেবুর উত্পত্তি যেখানেই হোক, এটা কিন্তু পরিযায়ী পাখির মতো নানা দেশ পরিভ্রমণ করেছে। লেমন শব্দটি প্রথম ইংরেজি অভিধানে প্রবেশ করে ১৩৫০-১৪০০ সালের মধ্যে। লিমন আবার ফরাসি শব্দ। এজন্য ধরে নেওয়া ফরাসি থেকে ইংরেজিতে এসেছে। আবার ফরাসিরা শব্দটি পেয়েছে ইতালির লিমোনি থেকে। আর ইতালিয়ানরা পায় আরবদের শব্দ লাইমুন থেকে। পারস্যে এটাই লিমুন। বাংলার লেবু হয়তো হিন্দি বা উর্দুর লিম্বু থেকে এসে থাকবে।

যেই দেশ থেকেই আসুক না কেন, লেবুর পুষ্টিগুণ বলে শেষ করা যাবে না। অন্যান্য ফলের চেয়ে লেবুতে ভিটামিন সি-এর পরিমাণ অনেকটাই বেশি। তাছাড়া এটি ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়ামেও সমৃদ্ধ। অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টসের জোগান হিসেবে এবং ইমিউনিটি বুস্টার হিসেবে লেবু খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিত্সকেরা। আমরা সাধারণত খাবারের স্বাদ বাড়াতে এবং গরমের দিনে শরবত তৈরি করতে লেবু ব্যবহার করি। কিন্তু এর উপকারিতা এখানেই শেষ নয়। এর রয়েছে নানা কার্যকর ভূমিকা। সতেজ রাখে, ওজন কমায়, ত্বক সুন্দর রাখে, হজমে সহায়তা করে, নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ দূর করে, কিডনির পাথর হওয়া রোধ করে, রক্ত পরিশুদ্ধ করে, ক্যানসার প্রতিরোধ করে। আর এই ফিরিস্তি দিয়ে শেষ করা যাবে না। এমনকি লেবু দিয়ে নানা মুখরোচক পদও তৈরি হয়। রান্নার নানা কাজেও রয়েছে লেবুর ভূমিকা।

নানা গুণের কারণে অনেকে লেবু বেশি বেশি খেয়ে থাকেন। যদিও এটা ভালো নয়। কোনো জিনিসই অতিরিক্ত ভালো নয়। লেবু খাওয়াও নয়, লেবু কচলানোও নয়। বেশি লেবু খেলে প্রচুর পরিমাণে শরীরে ভিটামিন সি প্রবেশ করে নানা রকম শারীরিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। চিকিত্সকদের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় ভিটামিন সি-যুক্ত খাবার খেলে ফুসফুস বিকল হয়ে যাওয়া, হজম ক্ষমতার লোপ পাওয়া, কিডনির সমস্যা, রক্তের ঘনত্ব কমে যাওয়া, হাড় ক্ষয়ে যাওয়া, দাঁতের গঠন খারাপ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। বয়স্ক, শিশু কিংবা যাদের হজমক্ষমতা দুর্বল বা যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে আরো মারাত্মক। অনেকে মনে করেন, লেবু খেলে করোনার প্রকোপ কমে। আর এ কারণে বাজারে লেবুর চাহিদা অনেক বেড়েছে। পাইকারি বাজারে লেবুর হালি ৩৫-৪০ টাকা হলেও খুচরা বাজারে হালি বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫০ টাকা দরে। অথচ এ লেবুর হালি গত কয়েক বছর ধরেই ছিল ৮ থেকে ১৫ টাকার মধ্যে। লেবু এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। অপরিপক্ব লেবুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখেই সাধারণ মানুষকে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

অথচ পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে উত্পাদন বাড়িয়ে লেবুর মতো ফসলের দুষ্প্র্রাপ্যতা সহজেই কমানো যেতে পারে। এটি দেশের সব স্থানেই চাষযোগ্য। তবে সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও মৌলভীবাজারে তুলনামূলক বেশি জন্মে। এছাড়া অন্য জেলায়ও প্রচুর পরিমাণে লেবু উত্পন্ন হয়। কৃষক অল্প খরচে অনায়াসে চাষ করতে পারেন। ছাদেও লেবু ফলানো সম্ভব।

পুষ্টিবিদরা বলে থাকেন—কেবল আজ নয়, লেবু হোক আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। খাবার হিসেবে আমরা লেবুকে নিত্যসঙ্গী বানাতে পারিনি। কিন্তু লেবু কচলানোর বিদ্যায় অসাধারণ দক্ষ হয়ে উঠেছি। ‘লেবু কচলালে তিতা হয়’ কিন্তু যে কচলায় সে মনে করে আরেকটু রস পেলে মন্দ কী! এই আরেকটু রস পাওয়ার আশায় সে কচলাতে থাকে। শেষে আরেকটু রস পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু লেবুর সেই সুবাস বা স্বাদ কোনোটাই আর অবশিষ্ট থাকে না। এই অতিরিক্ত রসটুকু লেবুর পুরো স্বাদকেই বিস্বাদ করে দেয়। বেশি কচলানোর কারণে লেবুর সুস্বাদু শরবতও তিতা হয়ে যায়। তার পরও আমাদের দেশের মানুষ লেবু কচলাতে ভালোবাসে!

রসিক মানুষজন রস, ছাল-চামড়া খেয়েই সন্তুষ্ট নয়, তারা লেবু নিয়ে অনেক কৌতুকও তৈরি করেছেন। একদিন বাজারে কলার সঙ্গে লেবুর দেখা হলো। লেবুকে দেখেই কলার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি এলো। ডাক দিল লেবুকে— কি রে লেবু, কেমন আছিস?

- এই তো ভালো। তুমি ভালো আছ তো?

- হ্যাঁ, ভালোই আছি। আচ্ছা লেবু, শুনলাম, মানুষ নাকি তোকে চিপেচুপে নিয়ে তারপর খায়? বলেই কলার দুষ্টু হাসি! লেবুর তো প্রথমে খুবই মন খারাপ হলো। এরপর নিজেকে সামলে লেবুও পালটা জবাব দিল, তা তো খায়ই। কিন্তু তোমার যে গল্প শুনলাম, সে তো আরো খারাপ। তোমাকে নাকি ন্যাংটো করে তারপর খায়! অতএব জয় লেবুর রসের জয়।

পুনশ্চ : একজন জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন, লেবু বেশি কচলালে তেতো হয়ে যায়, চা বেশি জ্বাল দিলে বিষাক্ত হয়ে যায়, স্ক্রু বেশি টাইট দিলে প্যাঁচ কেটে যায় আর মানুষকে বেশি মাথায় তুললে ঘাড়ে বসে চুল টেনে ছিঁড়তে চায়। কাজেই সাবধান, কাউকে অতিরিক্ত মাথায় তুলবেন না!

লেখক :রম্যরচয়িতা