একজন শুভ্রমানসের কথা

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২১, ২২:০১

ফরিদপুরের জগদীশ চন্দ্র ঘোষ ওরফে তারাপদ স্যারের প্রয়াণের খবর আমার মতো তার শত-সহস্র ছাত্রছাত্রীকে ব্যথিত করেছে। ৯৩ বছর বয়সে তার প্রয়াণ ঘটলেও করোনার আগেও তিনি কর্মক্ষম ছিলেন। শুভ্র পোশাকে ছাতা হাতে তিনি হেঁটে চলে বেড়াতেন ফরিদপুরের নানা প্রান্তে। স্যার কেমন শিক্ষক ছিলেন, তার ছাত্র হিসেবে এটা বলার মতো কিছু ঘটনার সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ৬১ বছর আগে, ১৯৬০ সালে তারাপদ স্যার ফরিদপুরের ময়েজউদ্দিন হাইস্কুল থেকে ফরিদপুর হাই স্কুলের শিক্ষক হয়ে আসেন। তখন আমি হাই স্কুলের ক্লাস সিক্সের ছাত্র। সাইডে পকেটওয়ালা, বোতাম না লাগানো, সাদা শার্ট আর সাদা পায়জামা পরা তেত্রিশ বছর বয়সি এই সুঠামদেহী শিক্ষককে আরো কাছ থেকে জানার সুযোগ হয় ক্লাস নাইনে ইলেকটিভ ম্যাথস নেওয়ার ফলে। তিনি আমাদের সাধারণ গণিত এবং ইলেকটিভ ম্যাথ দুটোই পড়াতেন। হাই স্কুলে ইলেকটিভ ম্যাথ পড়ার ছাত্র ছিল কম। সেই সুবাদে ইলেকটিভ ম্যাথ ক্লাসের সব ছাত্রকে তিনি কাছ থেকে চিনতেন এবং নাম ধরে ডাকতেন। ক্লাস নাইনের হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় ইলেকটিভ ম্যাথসে ৮৫ নম্বর পেয়ে স্যারের নজরে পড়ে গেলাম। তিনিও আমাকে শিক্ষকদের বসার ঘরে ডেকে নিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘তুমি ১৫ নম্বর কম পেলে কেন?’

৩৩ নম্বর পেলে পাশ, আর ৮০ নম্বর পেলে লেটার, আমি ৮৫ নম্বর পেয়েছি—তাতে স্যারের মন ওঠে নাই। আমি কী বলব তা চিন্তা করার আগেই স্যার বললেন, ‘এখন থেকে ১০০ পাওয়া চেষ্টা করবে। ম্যাট্রিকে ফার্স্ট ডিভিশন পেতে হবে।’

প্রাইমারি স্কুলে অঙ্কে ১০০ পেয়েছি তাতে বিরাট কিছু মনে হয় নাই। কিন্তু ক্লাস নাইন-টেনে যে ১০০ পাওয়া যায় সে কথা কোনো দিন চিন্তা করি নাই। কেউ কোনো দিন বলে নাই। স্যারের কথায় আমার সাহস বাড়ল। নিজের সামর্থ্য সম্বন্ধে আস্থা এলো। ক্লাস নাইনের বার্ষিক পরীক্ষার পরে স্যার আবার আমাকে শিক্ষকদের বসার ঘরে ডেকে বললেন, ‘তোমার খাতার নম্বরগুলো যোগ করে দেখত, ১২০ হয় কেন?’

এবার সাহসের সঙ্গেই বললাম, ‘স্যার, আপনি যে কোনো ১০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে বলেছিলেন, আমি বারোটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি।’

স্যার রাগ করতে পারে তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু তিনি রাগ করলেন না। তিনি হেসে বললেন, ‘তুমি আমাকে খাটিয়েছ, তোমাকে ১০০ দিব না ৯৯ দিব।’ আমি বললাম, ‘স্যার, এখন আপনি ৩৩ দিলেও আমার কোনো অসুবিধা নাই।’ স্যার বললেন, ‘এই দেখো, ছয় মাসের মধ্যেই তোমার কত উন্নতি হয়েছে! অঙ্ক করতে শিখেছ, কথাও বলতে শিখেছ। মানুষের জন্য কিছুই অসম্ভব নয়। তোমার বাবা গরিব মানুষ, তোমাকে বড় হতে হবে।’

স্যারের এই কথাগুলো আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। শিক্ষকতার বাইরে, তিনি প্রথমে পাকিস্তান অবজারভার এবং পরে বাংলাদেশ অবজারভার কাগজের মফস্সল সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম দুই ধর্মের ছাত্রদের সমান যত্ন নিয়ে শিখিয়েছেন। ধর্মের নামে রাষ্ট্র হলে পরিশেষে মানুষের ভালো হবে না মন্দ হবে—এই বিতর্কে তিনি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এবং হুমায়ুন কবীরের যুক্তিতে বিশ্বাস করতেন। তবে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানের আইন মেনেই এদেশে থেকেছেন। তবু হিন্দুধর্মে বিশ্বাস করার একমাত্র অপরাধে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তার পিতা এবং ভাইসহ পরিবারের ছয় জন সদস্যকে হত্যা করেছে। জীবনের চেয়ে বড়ো এই মহান শিক্ষকের, ৯৩ বছরের কর্মময় এবং বর্ণাঢ্য জীবন ফরিদপুরের বিপুলসংখ্যক মানুষকে আলোকিত করেছে। তারাপদ স্যার ঘোষ বংশের লোক হলেও তার পূর্বপুরুষেরা কেউ মিষ্টি তৈরি করেছে কি না, তা আমার জানা নাই। তবে জগদীশ চন্দ্র ঘোষ প্রচুর মিষ্টি খেতে পারতেন। স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে তিনি স্টেশন রোড সাদীর দোকানে বসে একের পর এক রাজভোগ খেয়ে যেতেন। পাঁচ বছর আগে একদিন স্যারকে মিষ্টি খাওয়ার কথা জিগ্যেস করায় তিনি জবাব দেন—‘আমার কোনো ডায়াবেটিক-টেটিক নাই। ওরা অযথাই আমার বাড়ির পাশে ডায়াবেটিক হাসপাতাল করছে। আমি এখনো দুই-চারটা রাজভোগ খাই, আমার কোনো অসুবিধা হয় না, তবে আমি কিন্তু রাজভোগ ছাড়া অন্য কোনো মিষ্টি খাই না, কারণ রসের নিচে ডুবে থাকে বলে রাস্তার ধুলোবালি এই মিষ্টিকে স্পর্শ করতে পারে না।’

একদিন স্যারকে আমার বাড়ি নিয়ে এলাম। প্লেট ভরে রাজভোগ দিলাম। শিশুর মতো পুলকিত হয়ে স্যার মিষ্টি খেলেন। স্যারের বয়স হয়েছিল—যে বয়সে শরত্ ও হেমন্তকালের তফাত বুঝতে অসুবিধা হয়। মানুষের শ্রদ্ধাঞ্জলি যখন সহানুভূতিতে পরিণত হয় তখন বেঁচে থাকার সুখ কমে আসে। তবুও জগদীশ চন্দ্র ঘোষ বেঁচে ছিলেন জীবনের যা কিছু ভালো তার প্রতীক হয়ে, আমাদের শিক্ষক, নির্ভীক সাংবাদিক, সততা আর নিষ্ঠার প্রতিচ্ছবি হিসেবে। ‘অতিথি’ গল্পে রবীন্দ্রনাথের কথা সত্য—‘তারাপদ চলে গেছে।’ এক বিশ্ববিধ্বংসী ভাইরাস স্যারকে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি অসুখের কাছে পরাজিত হয়েছেন, মৃত্যুর কাছে নয়। তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী।

(ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম এশিয়ান রিসোর্স সেন্টার থেকে)