৭৩ বছরের সঙ্গী হারালেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২১, ২২:৪৮

প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যুর শার্লট নামের এক নারী টুইটার বার্তায় লিখেছেন, ‘আপনি যে ধরনের জীবন-যাপন করেন না কেন আমি মনে করি রানি আপনাকে ছাড়া কিছুই করতে পারতেন না। আপনি রাজপ্রাসাদে একটি নক্ষত্র হিসেবেই ছিলেন’। সত্যিই তাই। রানি তার ৭৩ বছরের জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে শোকে কাতর হয়ে পড়েছেন। তিনি আটদিনের শোক পালন শুরু করেছেন। খবর বিবিসি ও ডেইলি মেইলের

৬০ বছরের ও বেশি সময় ব্রিটেনের রানির পার্শ্ব সহচর ও একান্ত সমর্থক প্রিন্স ফিলিপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ রাজ পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিতে পরিণত হন । রানির জীবন সঙ্গী হলেও ফিলিপের কোনো সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল না। কিন্তু রাজ পরিবারের এতো ঘনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ তিনি ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। রানির আদেশেই ব্রিটিশ রাজতন্ত্রে একসময় তিনি হয়ে ওঠেন দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। জীবন সঙ্গী হিসেবে রানিকে তার কাজে সহযোগিতা করলেও বিশেষ কিছু কাজের ব্যাপারে প্রিন্স ফিলিপের বিশেষ আগ্রহ ছিল। পরিবেশ ও তরুণদের জন্যে অনেক কাজ করেছেন তিনি। স্পষ্টভাষী হিসেবেও পরিচিতি ছিল প্রিন্স ফিলিপের।

এই দীর্ঘ সময় ধরে রানি ও ব্রিটিশ রাজ পরিবারের প্রতি একনিষ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতার জন্যে তিনি যথেষ্ট শ্রদ্ধাও অর্জন করেন। রাজ পরিবারের নানা আনন্দ উত্সব আর কঠিন চ্যালেঞ্জের সময় তিনি সবসময় ছিলেন রানির পাশে। নিজের ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে তিনি একবার বলেছিলেন, তার কাছে যেটা সবচেয়ে ভাল মনে হয়েছে তিনি সেই কাজটাই করেছেন। তিনি বলেন, কেউ কেউ মনে করেন ঠিক আছে, আবার কেউ ভাবেন ঠিক হয়নি- তো আপনি কি করতে পারেন! আমি যেভাবে কাজ করি সেটাতো আমি হঠাত্ করে বদলাতে পারি না। এটা আমার স্টাইলেরই একটা অংশ।’

এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাত্

ডপ্রন্স ফিলিপ যখন ডার্টমাথে ব্রিটানিয়া রয়্যাল নেভাল কলেজের ক্যাডেট, তখন ওই কলেজ পরিদর্শন করেন রাজা ষষ্ঠ জর্জ এবং রানি এলিজাবেথ, সঙ্গে ছিলেন তাদের দুই কিশোরী কন্যা প্রিন্সেস এলিজাবেথ ও প্রিন্সেস মার্গারেট। ওই সফরে দুই কিশোরী প্রিন্সেসের সাথী হয়ে তাদের সঙ্গ দেন প্রিন্স ফিলিপ। তরুণ প্রিন্স ওই সফরে ১৩ বছরের প্রিন্সেস এলিজাবেথের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিলেন। সেটা ছিল ১৯৩৯ সাল। ১৯৪২ সালের অক্টোবরের মধ্যে প্রিন্স ফিলিপ হয়ে ওঠেন রয়্যাল নেভির তরুণতম ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট। এই সময় তারা দু’জন প্রচুর চিঠি চালাচালি করেছেন। বেশ কয়েকবার রাজপরিবারের সঙ্গে থাকার আমন্ত্রণও পেয়েছেন তিনি। এরকমই একটি সফরের পর ১৯৪৩ সালের বড়দিনের সময় এলিজাবেথ তার প্রসাধনের টেবিলে প্রিন্সের একটি ছবি সাজিয়ে রাখেন। তাদের সম্পর্ক গভীর হয়ে ওঠে যুদ্ধ পরবর্তী দিনগুলোতে। কিন্তু তাদের এই সম্পর্কের বিরোধিতা করেছিলেন রাজপরিবারের কেউ কেউ। কারণ তারা মনে করতেন ফিলিপের আচরণ ‘রুক্ষ্ম ও খুব ভদ্রোচিত’ নয়। কিন্তু প্রিন্সেস এলিজাবেথ বেশ ভালোভাবেই ফিলিপের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালের গ্রীষ্মে ফিলিপ রাজার কাছে গিয়ে তার কন্যাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন এবং প্রথম সাক্ষাতের আট বছর পর তারা বিয়ে করেন।

ডবয়ের আগে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিতে হয় ফিলিপকে। গ্রিক পদবী বাদ দিয়ে তিনি নেন মায়ের ইংরেজ পদবী মাউন্টব্যাটেন। বিয়ের অনুষ্ঠানের আগের দিন রাজা ষষ্ঠ জর্জ তাকে ‘হিজ রয়্যাল হাইনেস’ উপাধি দেন। আর বিয়ের দিন সকালে তাকে করা হয় ‘ডিউক অফ এডিনবারা।’ ওয়েস্টমিনস্টার গির্জায় ১৯৪৭ সালের ২০ নভেম্বর তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সেই সময় উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন যুদ্ধ পরবর্তী ব্রিটেনের ধূসর দিনগুলিতে ওই বিয়ে ছিল রংয়ের ঝলকানি।

শুধু একটা কীট

ডিউক এসময় সামাজিক জীবনে খুব সক্রিয় হয়ে ওঠেন। কিছু পুরুষ বন্ধুকে নিয়ে প্রতি সপ্তাহে লন্ডনের কেন্দ্রে সোহো এলাকার রেস্তোঁরায় ঘন্টার পর ঘন্টা লাঞ্চ খাওয়া, রাতের বেলা ক্লাবে যাওয়া এসব তার জীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠে। আকর্ষণীয় বন্ধুদের সঙ্গে তার ছবি দেখা যায় নানা জায়গায়। পরিবারের ভেতর তার কর্তৃত্ব বজায় থাকলেও ছেলেমেয়েরা বাপের পারিবারিক নাম ‘মাউন্টব্যাটেন’ ব্যবহার করতে পারবে না বলে রানির দেওয়া সিদ্ধান্ত একটা তিক্ত পরিবেশ তৈরি করে। ‘আমি এদেশে একমাত্র বাপ যে তার ছেলেমেয়েকে নিজের পিতৃপরিচয়ে পরিচিত করাতে পারে না,’ এক বন্ধুর কাছে এই অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘আমি তো শুধু একটা ফালতু কীট!’ পিতা হিসাবে বেশ কড়া ছিলেন ডিউক। অনেকে মনে করতেন তিনি ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে স্পর্শকাতর নন। প্রিন্স চার্লসের জীবনীকার জনাথান ডিম্বলবি লিখেছেন তাঁর অল্প বযসে সবার সামনে বাবা তাঁকে এমনভাবে তিরস্কার করতেন যে তার চোখে জল এসে যেত। বাবা ও বড় ছেলের সম্পর্ক কোনো সময়ই সহজ ছিল না। চার্লসের জন্য বোর্ডিং স্কুলের কঠোর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার যে নীতি তিনি নিয়েছিলেন তা বাবা ও ছেলের মধ্যে একটা টানাপোড়েন তৈরি করেছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ছেলে যখন ছোট তখন বাবা হয়ে তার মনের কথা বোঝার চেষ্টা তিনি করেননি।

তরুণদের উন্নতি ও বিকাশের বিষয়ে তিনি বরাবর খুবই সচেতন ছিলেন। এই আগ্রহ থেকে ১৯৫৬ সালে তিনি ব্যাপকভাবে সফল একটি উদ্যোগ চালু করেন ডিউক অফ এডিনবারা অ্যাওয়ার্ড নামে। এই উদ্যোগে লাভবান হয়েছে বিশ্বব্যাপী ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী প্রায় ৬০ লাখ সক্ষম ও প্রতিবন্ধী তরুণ, যারা বাইরের নানা চ্যালেঞ্জিং কর্মকা্লে তাদের শারিরীক ও মানসিক যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পেয়েছে।

‘তরুণরা যদি যে কোনো ক্ষেত্রে সাফল্য দেখানোর সুযোগ পায়, তাহলে সেই সাফল্যের অনুভূতি তারা অন্যদের মধ্যেও সঞ্চারিত করতে পারবে,’ বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন ডিউক অফ এডিনবারা। সারা বিশ্বে প্রতিবন্ধীদের উত্সাহিত করতে অনেক কাজ করেছেন তিনি। ডিউক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মতো বিষয়ে খুবই উত্সাহী ছিলেন। কিন্তু ১৯৬১ সালে ভারত সফরের সময় একটি বাঘকে গুলি করতে তার সিদ্ধান্তের কারণে তাকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। তবে পরে তিনি বন্যপ্র্রাণী সংরক্ষক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন এবং তার প্রভাব ও উদ্যোগ কাজে লাগিয়ে বন্য প্রাণী সংরক্ষণে বড় ধরনের ভূমিকা রাখেন।

বিশ্বের অরণ্যাঞ্চল রক্ষার ব্যাপারেও তিনি আন্তরিক ছিলেন এবং এ ব্যাপারে এবং মহাসাগরে বেশি মাছ ধরার বিরুদ্ধে তিনি প্রচারণা চালিয়ে অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। শিল্পকে উত্সাহিত করার ক্ষেত্রেও তার একটা বড় অবদান ছিল। নানাধরনের খেলাধুলার প্রতি তার ছিল অদম্য উত্সাহ এবং নিজে অনেক ধরনের খেলার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন প্রিন্স ফিলিপ।

পরিবারের শক্তি

সাংবাদিক জনাথান ডিম্বলবির লেখা চার্লসের জীবনীগ্রন্থটি প্রকাশ পাওয়ার পর তার বড় ছেলে প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে তার টানাপোড়েনের কথা প্রথম জনসমক্ষে আসে। বলা হয় ডিউক অফ এডিনবারাই প্রিন্স চার্লসকে লেডি ডায়ানা স্পেনসারকে বিয়ে করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানদের বিয়ে নিয়ে সমস্যার সময় আবার তিনিই সবচেয়ে বেশি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রিন্স ফিলিপ তাদের সমস্যার কথা বোঝার চেষ্টা করেছেন সম্ভবত রাজ পরিবারে বিয়ে করার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে। তার চার সন্তানের মধ্যে তিনজনের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি তাকে পীড়া দিয়েছিল। তার সন্তানদেরও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কথা বলতে তিনি অস্বীকার করেছেন সবসময়। তবে বলা হয়, ডায়ানার প্রতি রাজ পরিবারের ভেতর সবচেয়ে বেশি সমর্থন ছিল তার শ্বশুর ডিউক অফ এডিনবারার। ডায়ানার তাকে লেখা চিঠির উষ্ণ ভাষা ও ‘ডিয়ার পা’ সম্বোধন থেকে সেটা স্পষ্ট বলে অনেক রাজ পরিবার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেছেন। পুত্রবধূ ডায়ানার প্রতি তার যে বৈরি মনোভাব ছিল না তা প্রমাণ করার চেষ্টায় ডিউককে লেখা প্রিন্সেস ডায়ানার চিঠিগুলো প্রকাশ করা হয়েছিল ২০০৭ সালে।