আমার প্রথম স্কুল ছনহরা যতীশ প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেই স্কুলে ৩ বছর পড়েছি। প্রথম শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। সেই স্মৃতি আমার তেমন মনে নেই। এটুকু আমার মনে আছে, আমার ফুপু, যাকে আমি বাবা ডাকতাম, তিনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন স্কুলে। ছনহরা যতীশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর ছনহরা প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। এরপর ভর্তি হই ছনহরা ষোড়শী বালা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি। এসএসসি পাশ করি সেই স্কুল থেকে ১৯৮০ সালে।
প্রিয় স্কুলের নাম বলতে গেলে স্বাভাবিকভাবে ছনহরা ষোড়শী বালা উচ্চ বিদ্যালয়ের নামটা এসে যাবেই। কিশোর বয়সে যতটুকু আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনায় থাকার কথা, সেই সময়টুকু উপভোগ করেছি সেই স্কুলে। বিশেষ করে আমি যখন নবম শ্রেণিতে উঠি, তখন মনে হয়েছে আমার চারপাশ বদলে যেতে শুরু করেছে। সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা, আড্ডা বা তাদের সান্নিধ্য আমাকে অন্য ভুবনে নিয়ে গেছে। আমি পেয়েছি বিশাল জগতের হাতছানি। এ নিয়ে ‘বৃষ্টি নামে মনে’ নামে আমার একটা কবিতাও আছে ।
ছনহরা ষোড়শী বালা উচ্চ বিদ্যালয় চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ছনহরা গ্রামে অবস্থিত। সেই স্কুল বলতেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক পরিচ্ছন্ন মায়াবী গ্রামের ছবি। আর গ্রাম বললেই শৈশব লাফিয়ে ওঠে সরপুঁটির মতো, খেলা করে বুকের ভেতর। সবুজ বিল, ধান ভরা মাঠ, সবুজ ঘাস-তার পাশে বয়ে চলা নদী ‘চানখালী’ হঠাত্ নেচে ওঠে স্মৃতির জানালা ধরে। আমি পৌঁছে যাই অনেক বছর আগে, ফিরে যাই ছেলেবেলায়। যেখানে ঘাসফড়িঙের পেছনে ছুটতে ছুটতে সকালকে দুপুরের দিকে পাঠিয়ে দিতাম। আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্কুলের মাঠ, কিছু সহপাঠীর মুখ এবং এক প্রিয় শিক্ষকের পবিত্র ছবি। মুহূর্তে আমি চলে যাই বিদ্যালয় আঙিনায়, যেখানে সেই প্রিয় শিক্ষক আমাকে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে গেছেন সামনে, অন্ধকারের পরিমণ্ডল ছেড়ে আলোতে। তখন স্কুলের ভবন এখনকার মতো সুন্দর ছিলো না।
১৯৭৫ থেকে ১৯৮০ সাল। সেই সময়ে টিনের ছাউনিতে গড়া স্কুলের ছবিটি এখনো স্মৃতিতে ভাস্বর। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়তে হয়েছে সমাজ ও ইতিহাস। সেই সময়ে এগুলো কঠিন ও বিরক্তিকর মনে হতো। এখন তো এই বিষয়গুলোও অনিবার্যভাবে পড়তে হয়। স্কুল ছুটি হয়ে যেত কিন্তু আশা কিরণ চৌধুরীর ক্লাস শেষ হয় না। যে বিষয় নিয়ে পড়াচ্ছিলেন তা শেষ করেই ক্ষান্ত। প্রতিটি ছাত্রকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বোঝানোর ক্ষেত্রে তিনি অসম্ভব শ্রম দিতেন। স্কুল ছুটির পর, যে সব ছাত্র তাঁর কাছে পড়তে আগ্রহী, তাদের পড়াতেন। তবে বিনিময়ে কোনো টাকা নিতেন না আমার বাবা ছিলেন আমাদের পড়ালেখার ব্যাপারে খুব কড়া। স্কুল জীবনে আমি যেটা হতে চেয়েছিলাম, সেটা হতে পেরেছি কিনা জানি না। তবে সাংবাদিক লেখক হওয়ার ইচ্ছে ছিলো ছোটোবেলায়।
আমাদের সময় ও এখনকার সময়ে অনেক পার্থক্য। এখনকার ছেলেমেয়েদের পড়ার চাপ বেশি। সারাক্ষণই তাদের পড়ালেখায় থাকতে হয়। খেলাধুলা ও অন্যান্য বিষয়ে সময় দেওয়ার সুযোগ কম। বর্তমানের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলি, তোমরা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করছো। তোমরা অনেক মেধাবীও। শিক্ষক ও অভিভাবকদের কথা মেনে চলার চেষ্টা করো। দেখবে তোমাদের সেই পরিশ্রমের মূল্য তোমরা একদিন পাবে।
