দেশে করোনার সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। প্রতিদিনই মৃত্যুর রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় ফের কঠোর লকডাউনের ঘোষণা আসছে।
কিন্তু শিল্পকারখানা খোলা রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। একদিকে অর্থনীতি সচল রাখার জন্য শিল্পকারখানা খোলা রাখার বিষয়ে মালিক পক্ষ জোরালো অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। স্বাস্থ্য খাতের চরম সংকটকালে হাসপাতালগুলোতে যেখানে ঠাঁই নেই, সেখানে কলকারখানায় কর্মরত এই শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়লে তার দায় কে নেবে? চিকিৎসা না পেয়ে যেখানে প্রতিদিনই মানুষের হাহাকার বাড়ছে, সেখানে কারখানাগুলোতে সংক্রমণ বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। করোনার প্রভাবে দেশে সাধারণ মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। আর্থিক নিরাপত্তা না থাকায় মৃত্যুভয় নিয়েই তারা কর্মস্থলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
দেশে দীর্ঘদিন করোনা পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। এরপর মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দ্রুত সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে মানুষের মধ্যে যেমন উদাসীনতা রয়েছে, তেমনি স্বাস্থ্যবিধি মানাতে সরকারি জোর চেষ্টাও সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। লকডাউনের ঘোষণা দিয়েও কার্যকর করা যাচ্ছে না। এদিকে দেশের বহু শিল্পকারখানায় যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি কার্যকর সম্ভব হচ্ছে না।
অনেক শিল্পকারখানা শ্রমিক নির্ভর হওয়ায় সেখানে স্বল্প পরিসরে গাদাগাদি করে কাজ করতে হয়। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসুরক্ষার উপকরণ না থাকা, কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নত না হওয়ায় অনেকের পক্ষে স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হয় না। কোনো কারখানায় দূরত্ব মেনে কাজ করা সম্ভব হলেও, কারখানায় প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় গাদাগাদি করে অবস্থান করা, এমনকি একসঙ্গে খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। তাছাড়া কর্মস্থলে আসতে নির্ভর করতে হয় গণপরিবহন। নিত্য দিনের বাজার-সদাইয়ের জন্যও ভিড়ের মধ্যে যেতে হচ্ছে। সেজন্য অনেক সময় কারখানার ভেতরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেও সংক্রমণ ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর লকডাউন শুরু হলেও শিল্পকারখানা খোলা থাকতে পারে বলে জানা গেছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিল্পকারখানা খোলা রাখার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে চিন্তাভাবনা করছে সরকার। কিন্তু শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে কিছু বলা হচ্ছে না। অসুস্থ হয়ে পড়লে শ্রমিকদের দায় কে নেবে সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আসছে না। এমনকি অসুস্থ শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য কোনো নির্দিষ্ট হাসপাতালের ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না।
গতকাল রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ আবদুস সালাম কারখানা খোলা রাখার পেছনে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, গত বছর সাধারণ ছুটি ও পরবর্তীকালে দুই ঈদে শ্রমিকদের আবাসস্থল ত্যাগ করে গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা উপেক্ষা করা যায় না। লকডাউনের প্রথম দিন থেকেই ব্যাপক সংখ্যক শ্রমিক শহর ছাড়তে পারেন। এতে দেশব্যাপী সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। এই অবস্থায় বস্ত্র ও পোশাক খাত ও সহযোগী খাত লকডাউনের আওতাধীন রাখা হলে দেশব্যাপী সংক্রমণের বিস্তারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।
করোনার সংক্রমণ বিষয়ে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন দাবি করেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কারণে পোশাকশিল্পে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা খুবই কম। উল্লেখ্য, দেশে তৈরি পোশাকশিল্পে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে বাধ্যবাধকতা থাকলেও বহু কারখানা রয়েছে যেখানে কমপ্লায়েন্সের কোনো বালাই নেই। মানা হয় না ন্যূনতম কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা।
উল্লেখ্য, বিভিন্ন দেশে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউনের ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেখানে কারখানা খোলা রাখা হয় না। সেখানে শ্রমিকের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেই তাদের ঘরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বিশ্বের বহু দেশে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে বিধি নিষেধ আরোপ করার পাশাপাশি তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং টিকে থাকার জন্য ন্যূনতম খরচ বহন করা হচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য বেড়েই চলেছে। করোনার প্রভাবে যেখানে সাধারণ মানুষের আয় কমে যাচ্ছে সেখানে নিত্য দিনের খরচ না কমে উলটো বেড়েই যাচ্ছে। করোনার সংক্রমণ রোধে লকডাউনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইত্তেফাক/এমআর
