বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নদীগুলোর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনেক সভ্যতা। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজের জন্য নদ-নদীকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিল। বাংলাদেশের অধিকাংশ শহর, নগর ও বাণিজ্যকেন্দ্র নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ঢাকা, শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দর, কর্ণফুলী নদীর তীরে চট্টগ্রাম শহর এবং পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ময়মনসিংহ শহর গড়ে উঠেছে। কিন্তু বর্ষা মৌসুম ছাড়া প্রায় সব সময় নদীগুলোর জীবনে নেমে আসে দুর্দশা, উত্তরাঞ্চলের প্রায় সব নদী শুকিয়ে যায় এ সময়। ধু-ধু মরুভূমির মতো দেখায় নদীর বক্ষপিঞ্জর, হারিয়ে ফেলে তাদের সোনালি অতীত। যেন যৌবন ফুরিয়ে বার্ধক্যে পদার্পণ করে। চৈত্রের প্রখর রৌদ্রতাপে নদীর বালুকণাগুলো উত্তপ্ত অগ্নিশিখার ন্যায় হয়ে যায়।
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নদীর পানি জমিতে সেচ দিয়ে ফসল উত্পাদন করে আসছে। কিন্তু দিনে দিনে আমাদের নদীসমূহের অবস্থা করুণ থেকে করুণতর হচ্ছে। গবেষণা সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে বিগত ৫৭ বছরে ১৫৮টি নদী শুকিয়ে গেছে। বাংলাদেশ দুর্যোগ ফোরামের গবেষণা অনুযায়ী ১৯৬৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশে হ্রাসপ্রাপ্ত নদ-নদীর একটি সমীক্ষা ২০১০ সালে প্রকাশিত হয়। তাদের গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ১১৫টি নদ-নদী শুকিয়ে মৃতপ্রায়। ১৯৬০ সালে দেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার। পরের তিন দশকে তা কমে হয় ৬ হাজার কিলোমিটার। ২০০৫ সালে এটি আরো কমে যায়। তখন বর্ষায় নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল ৫ হাজার ৯৬৮ কিলোমিটার আর শুষ্ক মৌসুমে ছিল ৩ হাজার ৮৬৫ কিলোমিটার।
বিআইডব্লিউটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে নদ-নদীর মোট দৈর্ঘ্য ২৪ হাজার কিলোমিটার। তার মধ্যে মাত্র ৬ হাজার কিলোমিটারে নৌযান চলাচল করতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে আরো কমে গিয়ে হয়ে যায় ৪ হাজার ৩৪৭ কিলোমিটার। এই হিসাবে, ছয় দশকে (১৯৬০ থেকে ২০২০ সাল) দেশের নৌপথ অর্ধেক কমে গেছে। উত্তরাঞ্চলে নদীগুলোর ওপর অন্যায়ভাবে বাঁধ নির্মাণের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে সেচ ছাড়া হাজার হাজার বিঘা জমিতে ফসল উত্পাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক চরের জমি রয়েছে, যেখানে সেচ পাম্প দ্বারা আবাদ করা সম্ভব নয়, কিংবা সম্ভব হলেও দরিদ্র কৃষকের সাধ্যের বাইরে। অন্যদিকে নদীতে পানিও নেই, এমন অবস্থায় জমিগুলোতে ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে না।
রংপুর জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, রংপুর জেলায় ২৮টি নদীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নদীর নাম তিস্তা, যমুনেশ্বরী, ঘাঘট, চিকলি, ইছামতী, শ্যামাসন্দরী।
ফাগুন-চৈত্র মাসে জেলার বড় নদীসহ ছোট নদীগুলোতে পানির প্রবাহ থাকে না। রংপুর বিভাগের নদ-নদীগুলো সবই প্রায় পানিশূন্য ধু-ধু বালুচরের মতো দেখা যায়।
নদীগুলো রক্ষা করতে হলে অবৈধভাবে বাঁধ দেওয়া ও বালু উত্তোলন থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে এবং নদীর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সমাজে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব নদীর খননকাজ শুরু করতে হবে। এতে নদীগুলো পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক গতিপথ ফিরে পাবে। আর এভাবে অবহেলা করতে থাকলে ছোট নদীগুলো হয়তো দেশের মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।
