জীবন সবার আগে ঘরে থাকুন

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২১, ২২:৫৭

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন, দেশে গত সপ্তাহে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ প্রবল আকার ধারণ করলে মানুষের চলাচলের ওপর আমাদের কিছু কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হয়। তার পরও কোনোভাবেই সংক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে তাই আমাদের আরো কিছু কঠোর ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। আমি জানি, এর ফলে অনেকেরই জীবন-জীবিকায় অসুবিধা হবে। কিন্তু আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবন সর্বাগ্রে। বেঁচে থাকলে আবার সবকিছু গুছিয়ে নিতে পারব।

১৪২৮ বঙ্গাব্দের বাংলা নববর্ষের প্রাক্কালে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, গত বছরের মতো এ বছরও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে আমরা বাইরে কোনো অনুষ্ঠান করতে পারছি না। কারণ করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ নতুন করে আঘাত হেনেছে সারা দেশে। পয়লা বৈশাখের আনন্দ তাই গত বছরের মতো এবারও ঘরে বসেই উপভোগ করব আমরা। টেলিভিশন চ্যানেলসহ নানা ডিজিটাল মাধ্যমে অনুষ্ঠানমালা প্রচারিত হবে। সেই সব অনুষ্ঠান উপভোগ ছাড়াও আমরা নিজেরাও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘরোয়া পরিবেশে আনন্দ উপভোগ করতে পারি। অতীতের সব জঞ্জাল-গ্লানি ধুয়ে-মুছে আমরা নিজেদের পরিশুদ্ধ করব। দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যাব সামনের দিকে। গড়ব আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যত্—এই হোক এবারের নতুন বছরের শপথ। কবিগুরুর ভাষায় আবারও বলতে চাই :‘নিশি অবসান, ওই পুরাতন/ বর্ষ হলো গত/ আমি আজ ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন/ করিলাম নত/ বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও/ ক্ষমা করা আজিকার মতো/ পুরাতনের বছরের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যতো’।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ-বিদেশে যে যেখানেই আছেন, সবাইকে জানাই ১৪২৮ বঙ্গাব্দের আন্তরিক শুভেচ্ছা। শুভ নববর্ষ। আজ আবাহনের দিন। ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো/ ...মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’—কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী এই গান গেয়ে আজ আমরা আবাহন করব নতুন বছরকে। একই সঙ্গে শুরু হয়েছে মুসলমানদের পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস মাহে রমজান। আমি সব ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে পবিত্র মাহে রমজানের মোবারকবাদ জানাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গত বছর মার্চের প্রথম সপ্তাহের দিকে আমাদের দেশে করোনা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয়েছিল। নানা আশঙ্কা আর আতঙ্ক গ্রাস করেছিল আমাদের। সেসব মোকাবিলা করেই আমাদের টিকে থাকতে হয়েছে। এরই মধ্যে করোনা ভাইরাসের থাবায় আমরা হারিয়েছি আমাদের অনেক প্রিয়জনকে, আপনজনকে। আমি সবার রুহের মাগরিফরাত ও আত্মার শান্তি কামনা করছি। স্বজনহারা পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত বছর করোনা ভাইরাস আঘাত হানার পর আমাদের নানাবিধ বিরূপ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে। গত বছর আমরা একটানা ৬২ দিন সাধারণ ছুটি বলবত্ করেছিলাম। আমরা এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিতে পারিনি। বিদেশের সঙ্গে চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। এই অবস্থা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের যেখানেই এই মরণঘাতী ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ছে, সেখানেই এ ধরনের ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, মানুষের জীবন রক্ষার পাশাপাশি আমাদের অর্থনীতি, মানুষের জীবন-জীবিকা যাতে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে না পড়ে, সেদিকে আমরা কঠোর দৃষ্টি রাখছি। সবার সহযোগিতায় আমরা বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলাম, যার ফলে গত বছর করোনা ভাইরাস মহামারিজনিত প্রভাব আমরা সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি।

করোনা ভাইরাসের কারণে অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় গত বছর আমরা চারটি মূল কার্যক্রম নির্ধারণ করেছিলাম। চারটি কার্যক্রম হচ্ছে :(১) সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করা :সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘কর্মসৃজনকেই’ প্রাধান্য দেওয়া; (২) আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ প্রণয়ন :অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করা, শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজে বহাল রাখা এবং উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা; (৩) সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি :দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগণ, দিনমজুর এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত জনসাধারণের মৌলিক চাহিদা পূরণে বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি; (৪) মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি করা :অর্থনীতির বিরূপ প্রভাব উত্তরণে মুদ্রা সরবরাহ এমনভাবে বৃদ্ধি করা, যেন মুদ্রাস্ফীতি না ঘটে। এই চার মূলনীতির ভিত্তিতে আমাদের কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৩ কোটি টাকার ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। কলকারখানায় যাতে উত্পাদন ব্যাহত না হয়, সেই ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, হকার, রিকশাওয়ালা, দোকান কর্মচারী, স্কুলশিক্ষক, মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সেবাদানকারী, সাংবাদিকসহ নিম্ন আয়ের নানা পেশার মানুষকে সহায়তা দিয়েছি। প্রায় আড়াই কোটি মানুষকে বিভিন্ন সরকারি সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সরকার সব সময় আপনাদের পাশে রয়েছে। দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানার পর আমি দরিদ্র-নিম্নবিত্ত মানুষকে সহায়তার জন্য কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছি। আমরা ইতিমধ্যে পল্লি অঞ্চলে কর্মসৃজনের জন্য ৮০৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং পবিত্র রমজান ও আসছে ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ৬৭২ কোটিরও বেশি টাকা বরাদ্দ দিয়েছি। এর দ্বারা দেশের প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ৪২ হাজার নিম্নবিত্ত পরিবার উপকৃত হবে। গত বছর করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে ভিজিএফ, টেস্ট রিলিফসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের সৌভাগ্য, টিকা উত্পাদনের শুরুতেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টিকার ডোজ আমরা নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। ইতিমধ্যে ৫৬ লাখের বেশি মানুষকে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। যারা প্রথম ডোজ গ্রহণ করেছেন, তাদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া শুরু হয়েছে। আমরা পর্যায়ক্রমে দেশের সবাইকে টিকার আওতায় নিয়ে আসব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। আমরা যদি সবাই করোনা ভাইরাস মোকাবিলার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, অবশ্যই এই মহামারিকে আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হব, ইনশাআল্লাহ।