ঝিলিককে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে স্বামী

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২১, ২২:৫৬

স্বামীর পরকীয়া আছে—এই সন্দেহ থেকে ঝিলিক ১০টি ঘুমের ট্যাবলেট সেবন করেন। এর মধ্যে স্বামী সাকিবুল আলম মিশুও শরীরে পাঁচটি মরফিন ইনজেকশন নেন। এর সঙ্গে দুইটি ঘুমের ট্যাবলেট সেবন করেন। বিছানায় শুয়ে থাকার সময় পাশেই অনেকটা অচেতন অবস্থায় শুয়ে থাকে তার স্ত্রী। এর মধ্যেই ঝিলিক বলতে থাকেন, ‘তুমি মেয়ে নিয়া ঘুরতে গেছিলা।’ মিশু তখন তার মাথার নিচের দুইটি বালিশ নিয়ে ঝিলিকের মুখ চেপে ধরেন। প্রায় ১ মিনিট ধরে চেপে রাখার পর ঝিলিকের মুখের কথা বন্ধ হয়ে যায়। এভাবেই গত ২ এপ্রিল রাত ২টার দিকে রাজধানীর গুলশান-২ নম্বরের ৩৬ নম্বর সড়কের ২২/সি নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে গৃহবধূ ঝিলিক আলমকে হত্যা করা হয়। দুই দিনের পুলিশি রিমান্ডে থাকার পর গত ১১ এপ্রিল সাকিবুল আলম মিশু ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মইনুল ইসলামের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

ধনীর দুলাল সাকিবুল আলম মিশু ছিলেন মাদকাসক্ত। গুলশানের নিজেদের ফ্ল্যাটে মিশু, তার বাবা জাহাঙ্গীর আলম, মা সাইদা আলম, ছোট ভাই ফাহিম আলম ও ফাহিমের স্ত্রী টুকটুকি বসবাস করেন। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে মিশুর সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয় তার। পরে প্রেম হয়। মিশু বাবা-মায়ের কাছে পছন্দের বিষয়টি জানালে তারা ঝিলিকের পারিবারিক বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে বিয়েতে অমত দেন। কারণ, ঝিলিক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। মিশু ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। মিশু তাকে ছাড়া অন্য মেয়েকে বিয়ে করবেন না বলে জানিয়ে দেন। একপর্যায়ে ছেলের পছন্দ অনুযায়ী ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয় তাদের। কয়েক মাস তারা ভালোই ছিলেন। ২০২০ সালের শুরুর দিক থেকে শুরু হয় অশান্তি। বিয়ের পর মিশুর বাবা-মা ও ভাইবোন নির্যাতন শুরু করেন। ২০১৯ সালের জুনে ঝিলিককে মারধর করে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। দেড় মাস পর আগস্টের শুরুর দিকে মিশুকে খিলগাঁওয়ের একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে রাখা হয়। ২৪ দিনের মাথায় ঝিলিক মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র থেকে স্বামীকে নিয়ে গুলশানের শ্বশুরবাড়িতে ওঠেন। এরই মধ্যে ঝিলিক টের পান যে তার স্বামীর সঙ্গে ফেসবুকে স্বর্ণালী সারাহ নামে এক নারীর পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে মিশু তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাতেন। ঝিলিক তখন বুঝতে পারেন যে সংসার টিকিয়ে রাখতে সন্তান গ্রহণ করতে হবে। ঝিলিক অন্তঃসত্ত্বা হন। গত বছরের জুলাইয়ে তার কোল জুড়ে নেমে আসে আয়মান নামে ফুটফুটে সন্তান।

যেভাবে ঝিলিককে হত্যা করা হয় :আদালতে মিশু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, ঝিলিক তার পরকীয়া নিয়ে সব সময় সন্দেহ করত। ঘটনার দিন ২ এপ্রিল রাতে মিশু ময়মনসিংহের ভালুকায় তাদের ফার্ম হাউজ দেখতে যান। সঙ্গে ছিলেন তার বন্ধু সোয়াদ, তামিম ও দীপন। ঝিলিকের মধ্যে সন্দেহ হয় যে মিশু একজন নারীকে নিয়ে ভালুকায় যাচ্ছে। এ কারণে ঝিলিক ৫ মিনিট পরপর করে মিশুর মোবাইলে ভিডিও কল দিচ্ছিলেন। ভিডিও কলে ঝিলিক মিশুকে দেখিয়ে ১০টি ঘুমের ওষুধ সেবন করেন। এটা দেখে মিশু ভালুকা যাওয়া বাতিল করে গাড়ি ঘুরিয়ে ঢাকায় রওনা দেন। এরই মধ্যে মিশুর মা ফোন করে বলেন, ঝিলিক তার ছেলে আয়মানকে কাজের মেয়ের কাছে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। রাত ১টার দিকে মিশু গুলশান এলাকা থেকে তালা খোলার একজন মিস্ত্রিকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় যান। সেখানে বেডরুমের দরজার তালা ভেঙে দেখতে পান ঝিলিক অচেতন অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছে। ঝিলিককে উদ্ধার করে গাড়িতে করে সেন্ট্রাল হসপিটালে নিয়ে যায়। সেখানে অক্সিজেন দিয়ে চিকিত্সকরা তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। কিন্তু মিশু সুইসাইড কেস হতে পারে ভেবে ভয় পেয়ে ঝিলিককে বাসায় নিয়ে আসে। ঝিলিককে গোসল করিয়ে দিয়ে তরমুজের জুস খাওয়ায়। এরপর ঝিলিককে বিছানায় শুইয়ে দেন। রাত ২টার দিকে মিশু পাঁচটি মরফিন ইনজেকশন নেন। এরপর দুইটি ঘুমের ওষুধ সেবন করেন। বিছানায় ঝিলিকের পাশে শুয়ে পড়েন। এরই মধ্যে ঘুমের মধ্যেই ঝিলিক বলতে থাকেন, ‘তুমি মেয়ে নিয়া ঘুরতে গেছিলা।’ মিশু তখন তার মাথার নিচের দুইটি বালিশ নিয়ে ঝিলিকের মুখে চেপে ধরেন। প্রায় এক মিনিট ধরে চেপে রাখার পর ঝিলিকের মুখ থেকে কথা বন্ধ হয়ে যায়। সকাল ৭টার দিকে মিশুর মায়ের ডাকাডাকিতে তার ঘুম ভাঙে। পাশে দেখেন যে ঝিলিক শুয়ে আছে। তার মা ঝিলিকের শরীর ধরে বলেন যে ওর শরীর একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিতে হবে। এরপর মিশু তার ম্যানেজারের সহায়তায় ঝিলিককে গাড়িতে তোলেন। গাড়ির পিছনের সিটে ঝিলিককে শুয়ে রাখা হয়। হাতিরঝিলে আসার সময় গাড়িটি রোড ডিভাইডারে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনা ঘটে। এরপর ঝিলিককে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিত্সকরা জানান যে আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।