স্বাধীনতার এক অগ্রনায়কের বিজয়ের পথে যাত্রা

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২১, ২২:১৩

আমার বাবা সৈয়দ নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্রজীবন থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি একজন তুখোড় ছাত্রনেতা হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে তুলেছিলেন। গভীরভাবে জড়িয়ে ছিলেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গোড়া থেকেই গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।

জীবন বাজি রেখে যারা আমার বাবাকে সেই কঠিন সময়ে সহায়তা করেছিলেন তাদের কাছে আমরা চির কৃতজ্ঞ। সেসব উদ্যোগের ফলেই তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতির কাছে যে বিশাল দায়িত্বের ওয়াদা করেছিলেন তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পেরেছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৭ই এপ্রিল ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকারের সেই ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

৭১ পূর্ববর্তী সময়ে আমার বাবার কাজ যেহেতু ময়মনসিংহে ছিল, পরিবার নিয়ে তার বসবাসও ছিল সেখানেই। কিন্তু পার্টির গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেশি সময় তাকে ঢাকায় থাকতে হতো। ঢাকা শহরে আমাদের নিজেদের কোনো বাসস্থান না থাকায় আমার বাবা সাধারণত মগবাজারে আমার মেজো মামা মাসুদুজ্জামান সাহেবের বাসায় থাকতেন—সেটিই ছিল তার ঢাকার ঠিকানা।

২৫শে মার্চ রাতে আব্বা বঙ্গবন্ধুর বাসা থেকে মিটিং সেরে মগবাজারে ফেরেন অত্যন্ত চিন্তিত মনে। ফিরেই আমার মামি আম্মাকে বলেন ‘ভাবি, আমাদের আলাপ-আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে, পাকিস্তানি সেনারা আমাদের ওপর যে কোনো মুহূর্তে আক্রমণ করবে। বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, তিনি তার বাসাতেই অবস্থান করবেন।’ আমার মামি আম্মা ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, বিদুষী ও ধীর স্থির। কি ভয়ানক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে তিনি বুঝতে পারলেন ও সবকিছু বিবেচনা করে তিনি সেই রাতেই আব্বাকে তার ছোট ভাই শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলিম চৌধুরীর পুরানা পল্টনের বাসায় পাঠিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে আব্বাকে খুঁজতে আমার মামার মগবাজারের বাসায় পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করেছিল।

২৫শে মার্চের সেই কালরাতে ঢাকা শহরে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্রদের ওপর বিভীষিকাময় আক্রমণ চালানো হয় অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র দিয়ে। টুনু মামার (শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলিম চৌধুরী) পুরানা পল্টনের বাসা থেকে আব্বা নিশ্চয়ই ভয়াবহ সেই গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে সে সময় তিনি কী চিন্তা করছিলেন, কী চলছিল তার মনে?

২৭ তারিখ সকালে কারফিউ কিছুটা শিথিল হলে আমার মামাতো ভাই কর্নেল শফিকুজ্জামানের বন্ধু রাশেদ ভাই, তার বড় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে মগবাজারে আসেন আমার মামি ও তার পরিবারকে তাদের গ্রামের বাড়ি রূপগঞ্জে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কারণ সেই জায়গা তখনো নিরাপদ। কিন্তু আমার দূরদর্শী মামি আম্মা তাতে রাজি না হয়ে তাদের নির্দেশ দেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সৈয়দ নজরুল ইসলামকে তারা যেন নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার পর থেকেই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী মরিয়া হয়ে বাকি নেতাদের খুঁজছে। শহিদ ডা. আলিম চৌধুরীর বাসা আব্বার বেশি সময় থাকার জন্য নিরাপদ নয়, তাই সিদ্ধান্ত হলো তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার। সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী মামির (শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলিম চৌধুরীর সহধর্মিণী) ছোট ভাই স্বপন মামা আব্বাকে সেখান থেকে বোরকা পরিয়ে রিকশায় করে আমার সেজো মামার হোসনী দালানের বাসায় পৌঁছে দেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম হোসনী দালানের বাসায় অতি গোপনে দুই রাত ছিলেন। আমার আম্মা ও পরিবারের আর কেউ জানতো না আব্বা কখন কোথায় আছেন। আমার বড় ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আশরাফ, আব্বাকে পাগলের মতো চারদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন তখন। আমার স্মৃতিতে না থাকলেও, আম্মা ও পরিবারের অন্যদের মুখে হাজারো বার শুনেছি সেই সব কথা।

সেঝো মামা, মামি খুব সতর্কতা ও অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পরম যত্নে দুই রাত আব্বাকে তাদের কাছে রাখলেন। ২৯শে মার্চ ভোর বেলা মামাতো ভাই শফিকুজ্জামান, তার বন্ধু রাশেদ ভাই ও তার বড় ভাই তিন জন মিলে দুটি বেবিট্যাক্সি নিয়ে উপস্থিত হন হোসনী দালানের বাসায়। আমার মামি ও তার ছোট ভাইয়ের নববধূ মিলে মেঝো মামির (মগবাজারের মামি) পরিকল্পিত বুদ্ধিতে বিশাল সাইজের বোরকা আর পরচুলা জোগাড় করলেন। এত বড়সড় আর সিরিয়াস হাই প্রোফাইল এক নেতাকে একজন মহিলার সাজে সাজানো নিশ্চয়ই খুব সহজ ব্যাপার ছিল না, কিন্তু তারা নিষ্ঠার সঙ্গে সেই কাজটি সম্পন্ন করলেন। ছদ্মবেশী স্বাধীনতার এক অগ্রনায়ক সৈয়দ নজরুল ইসলাম হয়ে উঠলেন বুয়েটের তরুণ ছাত্র মিনু ভাই, রাশেদ ভাইদের পর্দানশীল অসুস্থ বৃদ্ধা মা। আল্লাহর নাম নিয়ে তারা বেবিট্যাক্সি করে রওয়ানা দিলেন রূপগঞ্জের পথে। এরপর সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জানতে পারেন যে, আব্বা আমাদের নানাবাড়ি বোয়ালিয়ায় আছেন। সঙ্গে সঙ্গে বড় ভাই একটি জিপ নিয়ে রওয়ানা হয়ে যান বোয়ালিয়ার দিকে। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন আনন্দ মোহন কলেজ ছাত্র সংসদের তত্কালীন ভি পি হামিদ ভাই ও জি এস বুলবুল ভাই, এরা তিন জনই দুর্দান্ত সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা। বোয়ালিয়া পৌঁছেই বড় ভাই সৈয়দ আশরাফ জানলেন আব্বা ততক্ষণে পৌঁছে গেছেন দিঘিরপাড়। সেই তরুণ বয়সেই দূরদর্শী বড় ভাই বুঝতে পারেন মুহূর্ত নষ্ট করার তখন সময় নেই, প্রতিটি সেকেন্ড অতি মূল্যবান। যেভাবেই হোক স্বাধীনতার এই অগ্রনায়ক, নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামকে পৌঁছে দিতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ে এবং খুঁজে বের করতে হবে বাকি নেতৃবৃন্দকে।

দিঘিরপাড় পৌঁছে বড় ভাই সেখানকার আয়োজন দেখে একটু থমকে যান, কিন্তু কাউকে কিছু না বলে তিনি দ্রুত আব্বার কাছে চলে আসেন। আব্বাকে দেখে মনে হলো যেন তিনি জানতেন যে, সেই মুহূর্তে তারা আসবে। তিনি যেন প্রস্তুত হয়ে তাদেরই অপেক্ষায় ছিলেন। বড় ভাই আর তাঁর সাথীরা সেই মুহূর্তেই কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আব্বাকে নিয়ে জিপে উঠে চলতে শুরু করেন আমাদের নানা বাড়ি বোয়ালিয়ার দিকে।

১১ই এপ্রিল একটি ছোট্ট বিমানে করে তাজউদ্দীন আহমদ, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম প্রমুখ হালুয়াঘাটের ঢালু পাহাড়ের নিচে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে খুঁজে পান এবং বিমানে তুলে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পাড়ি জমান এক স্বাধীনতার ইতিহাস রচনা করতে। পরবর্তী ইতিহাস সবার জানা। ১৭ই এপ্রিল ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন আমার বাবা এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির সুকঠিন দায়িত্বও তার ওপর ন্যস্ত হয়েছিল।

n লেখক :শহিদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ কন্যা