করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঁচড়ে পড়েছে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে। করোনায় মৃতের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হচ্ছে। স্বজন হারানোর কান্নায় ভারী হচ্ছে চারপাশ। মন্ত্রী-এমপিসহ দেশবরেণ্য অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন করোনায়। তবে যাঁরা করোনায় মারা গেছেন তাঁদের অধিকাংশের শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না। কারো অ্যাজমা, এসপাইরেটরি ডিজিজ, কিডনি, লাংস, হার্টের সমস্যা ছিল। আর যাঁরা শারীরিকভাবে ফিট থাকার পরও মারা গেছেন সেটা নিছক দুর্ঘটনা। যেমন অনেক সাবধানতার পরও মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। এ অবস্থায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করার কোনো বিকল্প নেই। নিয়মমাফিক এগুলো করতে পারলে করোনা বড় কোনো সমস্যা নয়। আর যারা শারীরিকভাবে বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন বা বয়স হয়ে গেছে তারা একটু সাবধান হোন। করোনা প্রাকৃতিকভাবে এসেছিল প্রাকৃতিকভাবেই হয়তো চলে যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কবে যাবে। করোনা নিয়ে বিশ্বে যা গবেষণা বা ভবিষ্যদ্বাণী হয়েছে তার অনেকটাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বলা হয়েছিল শীতকালে এর প্রকোপ বাড়বে। এদেশে হয়েছে এর উলটো। গরম যত বেড়েছে ততই এর প্রকোপ বেড়েছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউও একই সত্য প্রমাণ করছে। তবে এটাও সত্য—ইউরোপ-আমেরিকা-ব্রাজিলের মতো খারাপ অবস্থা বাংলাদেশে না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
বাংলাদেশের মানুষ এই ধরনের ভাইরাস বা রোগজীবাণুর সঙ্গে পরিচিত। বলা যায় আমরা প্রতিনিয়ত খাবারের সঙ্গে এমন ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া হজম করি। গ্রামের মানুষ সকালে যে পান্তাভাত খায় তাতে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা রোগজীবাণু থাকে। কিন্তু তাদের পাকস্থলী খুব সহজে তা হজম করে এবং কায়িক শ্রমের ক্যালরি সংগ্রহ করে। এই পান্তাভাত যদি ইউরোপ-আমেরিকা বা উন্নত বিশ্বের কোনো লোক খায় তবে সপ্তাহখানেক ফুড পয়জনিংয়ের পাশাপাশি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ত।
বাঙালিরা মাছ পচে গেলে গ্রামের বিশেষ শাক (পেপলি) দিয়ে চচ্চড়ি করে বা বেশি জ্বালিয়ে রান্না করে খায়। হাঁস-মুরগির রোগ হলে তা জবাই করে খাওয়া হয়। আর উন্নত বিশ্বে হাঁস-মুরগির সামান্য ফ্লু জাতীয় কিছু হলেই হাজার হাজার পশুপাখি পুড়িয়ে বা মেরে ফেলে। মাটিতে পুঁতে ফ্লু সংক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করে। আসলে আমাদের সঙ্গে করোনায় মৃতের সংখ্যায় ইউরোপ-আমেরিকার পার্থক্যের মূলে মূলত এটা। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, রোদ-গরমের তীব্রতা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। তা না হলে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা থাকার পরও ইউরোপ-আমেরিকায় করোনায় এত লোক মারা যাবে কেন! আর বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা থাকার পর মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম! আমার এক সহকর্মী সেদিন বললেন, করোনার গন্তব্য যদি ফুসফুস না হয়ে আমাদের পাকস্থলী হতো; তবে এতদিন বাংলাদেশ থেকে করোনা বিদায় নিত।
যত যুক্তি দেওয়া হোক, এটা আস্তে আস্তে ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে। এখন যে পরিস্থিতি এবং সামনে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি আসছে তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা কি আমাদের আছে? তাই নিজের জীবন নিজের কাছে। নিজের, পরিবার ও আশেপাশের লোকের জীবনের স্বার্থে সচেতন হোন, সারা বাংলাদেশ সচেতন হয়ে যাবে। সবার উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ মেনে চলা—স্বাস্থ্যসচেতন ও মানসিকভাবে শক্ত-বলিষ্ঠ হওয়া। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে করোনা আমাদের তেমন কিছুই করতে পারবে না। আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণচাঞ্চল্যে ফিরবে সামগ্রিক পরিস্থিতি।
গাজীপুর
