রিতা একটি উদাহরণমাত্র

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২১, ২২:১৩

নারায়ণগঞ্জের তারাবো হইতে হাঁটিতে হাঁটিতে গুলিস্তানে আসিয়া তরমুজ বিক্রয় করিতেছেন রিতা আক্তার নামের মধ্যবয়সি এক নারী। গতকাল ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত রিতার তরমুজ বিক্রয়ের আলোকচিত্র অনেক কথাই বলিয়া দেয়। সাধারণ অবস্থায় তারাবো হইতে গুলিস্তানে হাঁটিয়া আসিবার প্রশ্নই উঠে না। তবে লকডাউনে অসহায় গরিব মানুষের তো দুইটি পা ছাড়া এখন আর কোনো বাহন নাই। সুতরাং আমরা একটু দেখিয়া বুঝিতে পারি, নারায়ণগঞ্জের তারাবো হইতে গুলিস্তানে আসিতে কত সময় লাগিতে পারে? গুগল ম্যাপ বলিতেছে, এই দূরত্ব কমপক্ষে ১৭ কিলোমিটার। এই ১৭ কিলোমিটার পথ হাঁটিয়া আসা এবং তাহার পর সারা দিন হাঁটিয়া হাঁটিয়া তরমুজের ফালি বিক্রয় করিয়া পুনরায় তারাবোতে ফিরিয়া যাওয়া! কাটা ফল বিক্রয়ের মুনাফা দূরের কথা, বৈশাখের তপ্ত রোদে দিনভর হাঁটিয়া হাঁটিয়া ফেরি করিবার পরিশ্রমের মূল্যটুকুও সামান্য নহে। রিতা আক্তার নামের দরিদ্র এই নারী গুলিস্তানে হকারদের নিকট ভাত বিক্রয় করিয়া সংসার চালাইতেন। কিন্তু এই লকডাউনের সময় দুই মুঠো অন্নের সংস্থান করিবার জন্য তাহার সম্মুখে আর কোনো পথ খোলা আছে কি? পরিস্থিতি কতখানি খারাপ, তাহা রিতার নেকাবের আড়াল হইতে প্রকাশিত সজল চাহনি স্পষ্ট করিয়া বলিয়া দেয়। রিতার এমন চাহনি হাজার শব্দের বর্ণনার চাইতেও অনেক অধিক বাঙ্ময়। এমনিতেই কঠোর লকডাউন, বাহিরে লোকজন খুব সামান্যই, তাহার উপর রমজান মাস। স্বাভাবিকভাবেই আয়-রোজগার হারাইয়া চোখে অন্ধকার দেখিতেছেন রিতা আক্তার।

রিতা একটি উদাহরণমাত্র। আমরা প্রায়শই বলিয়া আসিতেছি, আমাদের যাহার যাহার অবস্থান হইতে কাজ করিয়া যাইতে হইবে। আমাদের স্ব স্ব দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠাবান হইতে হইবে। আমরা যদি যথাযথভাবে কর্মে ব্যাপৃত থাকি, তাহা হইলে যে কোনো সমস্যা ও জটিল অবস্থা হইতে একসময় আমাদের মুক্তি মিলিবে নিশ্চয়ই। বিজ্ঞজনেরা বলিয়া থাকেন, মানুষের প্রয়োজনের কোনো সীমাপরিসীমা নাই। মানুষ যদি তাহার প্রয়োজনের দাঁড়ি-কমা না টানিতে পারে, তাহা হইলে সে পাগল হইয়া যাইবে। এই ব্যাপারে ‘পথের সঞ্চয়’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চমত্কার কিছু দৃষ্টান্ত দিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, “একদিন মানুষ ছিল বুনো, ঘোড়াও ছিল বনের জন্তু। মানুষ ছুটিতে পারিত না, ঘোড়া বাতাসের মতো ছুটিত। মানুষ চাহিয়া দেখিত, আর তাহার ঈর্ষা হইত। সে ভাবিত, ‘ঐরকম বিদ্যুত্গামী চারটে পা যদি আমার থাকিত তাহা হইলে দূরকে দূর মানিতাম না, দেখিতে দেখিতে দিগিদগন্তর জয় করিয়া আসিতাম।’ মানুষ শুধু শুধু লোভ করিয়া বসিয়া থাকিবার পাত্র নহে। একদিন সে ফাঁস লাগাইয়া বনের ঘোড়াকে ধরিল। কেশর ধরিয়া তাহার পিঠের উপর চড়িয়া বসিয়া নিজের দেহের সহিত ঘোড়ার চার পা জুড়িয়া লইল। এই চারটে পা-কে সম্পূর্ণ নিজের বশ করিতে তাহার বহুদিন লাগিয়াছে, সে অনেক পড়িয়াছে, অনেক মরিয়াছে; কিন্তু কিছুতেই দমে নাই।”

মানুষ অবশ্য দমিবার পাত্র নহে। ইহা ঠিক যে চাহিদা এবং লোভ হইল আমাদের আধুনিক সমাজের চালিকাশক্তি; কিন্তু উহারও লাগাম থাকা প্রয়োজন। কোনো কিছুরই সীমা লঙ্ঘন করা উচিত নহে। সীমা লঙ্ঘনের পরিণাম কখনো ভালো হইতে পারে না। দেখা গিয়াছে, পৃথিবীতে অনাসৃষ্টি হইয়াছে, তাহা ঘটিয়াছে সীমা লঙ্ঘনের কারণেই। আমাদের সমাজে একটি শ্রেণি আছে কেবল অন্যের উপর পরজীবী হইয়া বাঁচিয়া থাকিবার জন্য। তাহাদের কেবল লক্ষ্য থাকে—আর কী কী চাওয়া যায়। অন্যদিকে আরেকটি শ্রেণি রহিয়াছে, যাহারা কেবল উদয়াস্ত আরো কিছু করিবার চেষ্টায় প্রাণপাত করিতেছে। মনে রাখিতে হইবে, এই বিশ্ব চালিত হইতেছে কর্মের চাকায়। সুতরাং স্ব স্ব ক্ষেত্রে কাজ করিতে হইবে। কাজের চাকা যেন বসিয়া না যায়।