সুস্থ তরুণরাই পারে দেশ গড়তে

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২১, ২২:১৫

সুন্দর পৃথিবীটা যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল তার আপন গতিতে ঠিক তখনই পৃথিবীতে হানা দিল করোনা মহামারি। মাত্র দেড় বছর  আগেও কেউ জানত না সার্স-কোভিড-২ ভাইরাসের অস্তিত্ব। কিন্তু এখন ভাইরাসটি সারা বিশ্বের প্রায় সবকটি দেশে আক্রমণ করেছে, সংক্রমিত হয়েছে কমপক্ষে ৭ কোটি ১১ লাখ মানুষ, মৃত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ। করোনা ভাইরাসটি ইতিমধ্যে বিশ্বের অর্থনীতি ধসিয়ে দিয়েছে এবং আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছে। ভাইরাস আক্রান্ত মানুষে ভরে গেছে হাসপাতালের বিছানা আর নির্জন করে দিয়েছে ব্যস্ত জনপদ, এর ফলে আধুনিক জীবনযাপন বিপর্যস্ত। বর্তমানের করোনা পরিস্থিতিতে তরুণ সমাজের ভয়াবহ অবস্থা। স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা যেভাবে ব্যাহত হচ্ছে ঠিক তেমনি থমকে গিয়েছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। দেশের বেকারত্ব বেড়ে চলেছে, দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা, অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটা ধ্বংসের মুখে। হতাশা, ব্যর্থতা, বিষণ্নতা, নিপীড়ন এসব দিনদিন বেড়ে চলেছে আমাদের তরুণদের মধ্যে যার ফলে আমাদের মানসিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, দেখা দিচ্ছে নানা রকম মানসিক সমস্যা। এসব মানসিক রোগের নাম আমাদের অধিকাংশেরই অজানা অথচ আমরাই কিন্তু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আছি। এতসব সমস্যার ভিড়ে অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

 করোনাকালে গেল এক বছরে সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন নারী-পুরুষ। পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের অবনতি, পড়াশোনা নিয়ে হতাশা, আর্থিক সংকট—এসব আত্মহত্যা ঘটনার মূল কারণ। এই ট্রমাগুলোর কারণে তরুণরা মানসিক চাপগ্রস্ত হন। অনেকে মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তীব্র ট্রমার কারণে অনেক ধরনের মানসিক রোগের পাশাপাশি ‘পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার’ নামের দীর্ঘমেয়াদি কষ্টদায়ী মানসিক রোগ হতে দেখা যায়। অল্প বয়সেই মানসিক রোগের প্রকোপ বেশি। প্রতি পাঁচ জন তরুণের মধ্যে কোনো না কোনো সময় অন্তত একজনের মানসিক রোগ হতে দেখা যায়। গুরুতর মানসিক রোগের মধ্যে ‘মেজর ডিপ্রেশন’,‘বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার’ এবং ‘সিজোফ্রেনিয়া’ উল্লেখযোগ্য। মানসিক রোগ যে কোনো দেশের জন্যই একটি বড় সমস্যা। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, স্বাস্থ্য বাজেটের শতকরা চার ভাগও মানসিক রোগের স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হয় না। তবে এটি হলো আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান। বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে এ ধরনের ব্যয় আরো অনেক কম হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

সিজোফ্রেনিয়ার মতো গুরুতর মানসিক সমস্যা থাকলেও অনেকে মনে করেন, এটা একটু-আধটু টেনশনের কারণে হচ্ছে, তেমন কিছু নয়। আবার অনেকের ধারণা, শিশুরা কোমলমতি ও নিষ্পাপ, মানসিক রোগ হওয়ার কথা নয়। করোনা-পরবর্তী সময়ে তরুণরা পুরোপুরি ভার্চুয়াল নির্ভর হয়ে পড়েছে। যার ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের বেশি অবনতি ছাড়াও নানা রকম অসুস্থতা দেখা দিচ্ছে। তারা বিছিন্ন হয়ে পড়ছে সর্বক্ষেত্র থেকে। এক্ষেত্রে সমাজ বা রাষ্ট্রের বিদ্যমান অর্জন ধরে রাখার বা সমাজ ও রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার কর্ণধার খুঁজে পাওয়া ভবিষ্যতে কঠিন হবে।

 বর্তমান তরুণ সমাজ এই ভার্চুয়াল জগতের ক্ষতির শিকার। যদিও এর ব্যতিক্রমও আছে। তবে তরুণ প্রজন্মকে দোষারোপ করে অভিভাবকের দায়িত্বহীনতাকে আড়াল করা যাবে না। তারা কিন্তু আমাদের আচরণই নিজেদের মতো করে রপ্ত করে থাকে। সমাজের কোনো কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল জগতে বসবাসকারী তরুণদের দক্ষতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। কমছে যোগাযোগের দক্ষতাও। দেখা যাচ্ছে, তারা সমস্যা মোকাবিলার বাস্তবভিত্তিক পদ্ধতি অবলম্বনের চেয়ে নেতিবাচক কৌশল গ্রহণ করছে। বাড়ছে আত্মহত্যাপ্রবণতা, মাদকের অপব্যবহার, সহিংসতা ও নির্যাতন। নিজেদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে সচেতন হওয়ার পর্যাপ্ত তথ্য তরুণ সমাজকে কি নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে? যদি তা না দেওয়া হয়, তবে এটাই হতে পারে তরুণদের অপরাধপ্রবণতার পূর্ববর্তী কারণ। তরুণ প্রজন্মের সুস্থ, সুখী ও প্রাণোচ্ছল জীবনযাপনে তাদের প্রয়োজনগুলোর প্রতি মনোযোগ দিন। এ লক্ষ্যে তরুণদের সঙ্গে অভিভাবকদের নিয়মিত আলাপচারিতা জরুরি। মনে রাখতে হবে, কেবল সুস্থ তরুণরাই পারে দেশের অর্থনীতিকে সঠিক স্থানে টিকিয়ে রাখতে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।