প্রিন্স ফিলিপের রাজকীয় শেষকৃত্যের আয়োজনে অনেক কিছুই অভিনব। রাজকীয় কর্মকাণ্ড যারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন না, তাদের বোঝার সুবিধার জন্য বিবিসির সৌজন্যে ডিউকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কিছু বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা দেওয়া হলো
প্রিন্স ফিলিপের ল্যান্ড রোভার
এটি একটি শক্ত বাহন, যা মূলত ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ব্যবহার করে থাকে। তবে ডিউক নিজে বহু দশক ধরে তার প্রিয় এই গাড়িটি ব্যবহার করেছেন। সুতরাং যখন শেষকৃত্যের পরিকল্পনা করা হড, তখন এই ল্যান্ড রোভার গাড়িটিরও সেখানে স্থান করে দেওয়া ছাড়া বিকল্প কিছু ছিল না। ডিউকের অনুরোধে এই বাহনটিকে সামরিক বাহিনীর মতো সবুজ রং করা হয়। তিনি গাড়িটির ওপরের সামনের অংশটিকে তার কফিন বহন করার মতো করে নতুনভাবে নকশা করেন। এর আগে রাজকীয় যেসব অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়েছে, তার সঙ্গে তুলনা করলে, শোকগম্ভীর এই শেষ যাত্রায় সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলের দিকে এগিয়ে যাওয়া ভারী এই বাহনটিকে ব্যতিক্রমী মনে হতে পারে। বছর জুড়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, নিজের বর্ণাঢ্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রিন্স ফিলিপ নাকি একবার রানিকে মজা করে বলেছিলেন, ‘আমাকে একটা ল্যান্ড রোভার গাড়ির পেছনে ঢুকিয়ে উইন্ডসরের দিকে চালিয়ে নিয়ে যেও।’
সরকারি বেন্টলি
যদিও রাজকীয় পরিবারের অনেক সদস্য ল্যান্ড রোভারের পেছনে হেঁটে যাবেন, তবে রানির বাহন ছিল বেশ আলাদা ধরনের, বেন্টলি স্টেট লিমোজিন। এই গাড়িটি ২০০২ সালে সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে রানিকে উপহার দেওয়া হয়েছিল, যা সাধারণভাবে স্টেট বেন্টলি নামে পরিচিত। গাড়িটির পেছনের দরজার নকশা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে রানি গাড়ি থেকে নামার আগে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন, যার ফলে রাজকীয় সফরের সময় রানি যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে গাড়ি থেকে নামতে পারেন। বেন্টলির তথ্য অনুযায়ী, দুই বছর ধরে গাড়িটি নির্মাণের সময় রানি এবং ডিউক নিয়মিতভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন।
রাজকীয় ভল্ট
ডিউককে উইন্ডসরের সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলের নিচে রাজকীয় ভল্টের ভেতরে সমাহিত করা হয়, সেখানেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। তার কফিন যখন রাজকীয় ভল্টের ভেতরে নামানো হয়, তখন ডিউকের ইচ্ছা অনুযায়ী সশস্ত্র শ্রদ্ধা জানানো হয়। চ্যাপেলের বিভিন্ন অংশে ৪৪ জন রাজকীয় ব্যক্তিত্বের কবর রয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন অষ্টম হেনরি, যিনি ১৫৪৭ সালে মারা গিয়েছিলেন। সেখানে আরো রয়েছেন, প্রথম চার্লস, যাকে ১৬৪৯ সালে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল, অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতাব্দীর রাজা তৃতীয় জর্জ, চতুর্থ জর্জ এবং পঞ্চম জর্জ। ২০০২ সালে ৭১ বছর বয়সে মারা যাওয়া রানির ছোট বোন প্রিন্সেস মার্গারেটের মৃতদেহ দাহ করা হয়েছিল, সেই ছাইও প্রথমে রাজকীয় ভল্টে রাখা হয়েছে।
গার্টার কিং অব আর্মস
ডিউকের কফিন রাজকীয় ভল্টে নামানোর পর গার্টার কিং অব আর্মস, যিনি রাজা বা রানিকে পতাকা, অনুষ্ঠানাদি ও প্রতীক ব্যবহার সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তিনি ডিউক অব এডিনবারার ‘শৈলী ও পদবি’ ঘোষণা করেন। এর মানে হলো, তিনি ডিউকের পুরো পদবি পড়ে শোনান, যা ১৩৩ অক্ষর লম্বা। সেই সঙ্গে রয়েছে তার অন্যান্য দায়-দায়িত্বের বর্ণনা, যেমন আর্ল অব মেরিওনেথ এবং ব্যারন গ্রিনিচ। সেই সঙ্গে তাকে সম্বোধন করার ধরনও তুলে ধরেন, যেমন ডিউক অব এডিনবারাকে ডাকা হতো ‘ইয়োর রয়্যাল হাইনেস’ অথবা ‘হিজ রয়্যাল হাইনেস’।
দ্যা ব্রিলিয়ান্ট স্টার অব জানি্জবার এবং অন্যান্য মেডেল
সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলের বেদিতে ৯টি কুশন রয়েছে, সেখানে ডিউকের পাওয়া পদক এবং অলঙ্কার প্রদর্শন করা হয়। নিজের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বিস্তারিত পরিকল্পনা করার সময় তিনি এসব পদক বাছাই করে দিয়ে গেছেন। রাজদণ্ড, অর্ডার অফ দি ব্রিলিয়ান্ট স্টার অব জানি্জবার, দি ব্রুনেই এস্টিমড ফ্যামিলি অর্ডার, দ্যা সিঙ্গাপুর অর্ডার অফ দারজাহ উতামা তেমাসেকওয়ের—এসব কুশনে মাছের তার দিয়ে সেলাই করা ছিল। ধারণা করা হয় যে, ডিউক ৫০টির বেশি দেশ থেকে পদক ও উপাধি পেয়েছেন।
পেজেস, সাজভৃত্য এবং সুরক্ষা
রাজকীয় পরিবারের সদস্যরা আস্তে আস্তে কফিন অনুসরণ করেন, যাদের মধ্যে ছিলেন রানির চার সন্তান, ডিউক অব কেমব্রিজ এবং ডিউক অব সাসেক্স। ডিউকের পারিবারিক অন্য সদস্যরা তাদের পেছনে ছিলেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন উইন্ডসর প্রাসাদের ঘনিষ্ঠ ভৃত্যরা, যারা তাদের ব্যক্তিগত কক্ষে কাজ করেছেন, তাদের খাবার এবং পানি দিয়েছেন। একজন ব্যক্তিগত সুরক্ষা কর্মকর্তা এবং ডিউকের ব্যক্তিগত সচিব, ব্রিগেডিয়ার বেকওয়েল—যিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে তার ডান হাত হিসাবে কাজ করেছেন, তিনিও এই শোক মিছিলে ছিলেন।
