বিদায় প্রিন্স ফিলিপ

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২১, ২২:৫৮

রাজকীয় শেষকৃত্যের পর সমাহিত করা হয়েছে ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্বামী ডিউক অব এডিনবরা প্রিন্স ফিলিপকে। গতকাল শনিবার ব্রিটেনের উইন্ডসর দুর্গের সেইন্ট জর্জস চ্যাপেলে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এরপর সেখানের রয়েল ভল্টে সমাহিত করা হয়েছে প্রিন্স ফিলিপকে।

গত ৯ এপ্রিল উইন্ডসর ক্যাসলে প্রিন্স ফিলিপ মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৯৯। তিনি ছিলেন ব্রিটেনের রাজপরিবারের ইতিহাসে কোনো রাজা-রানির সবচেয়ে দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী।  সিএনএনের এক খবরে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ রানি ও প্রিন্স ফিলিপের জীবন একটি অসাধারণ প্রেমের গল্পও। প্রিন্স ফিলিপকে সমাহিত করার মধ্য দিয়ে এ গল্পের এখনই সমাপ্তি হচ্ছে না। কারণ উইন্ডসর ক্যাসলে প্রিন্স ফিলিপকে স্থায়ীভাবে সমাহিত করা হয়নি। যখন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ মারা যাবেন তখন প্রিন্স ফিলিপের মরদেহ উত্তোলন করা হবে এবং কিং জর্জ ষষ্ঠ মেমোরিয়াল চ্যাপেলে তাদের পাশাপাশি সমাহিত করা হবে। কিং জর্জ ষষ্ঠ মেমোরিয়াল চ্যাপেল গির্জাটির আরেকটি অংশ। যেখানে রানির বাবা, মা ও বোনকে এরই মধ্যে সমাহিত করা হয়েছে।

শেষকৃত্যানুষ্ঠানে রাজপরিবারের সদস্যসহ মোট ৩০ জন অতিথি উপস্থিত ছিলেন। গির্জার অনুষ্ঠানে প্রায় পুরো সময়টা মাথা নুইয়ে একা বসেছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। নিশ্চুপ নীরবতায় ৭৩ বছরের জীবনসঙ্গীকে শেষ বিদায় জানান তিনি। খবর বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ানের।

রাজকীয় এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় গতকাল শনিবার ব্রিটেনের স্থানীয় সময় বিকাল ৩টায়। জানা গেছে, মৃত্যুর আগে প্রিন্স ফিলিপ ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যে, তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা যেন ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা হয়। তাই তার মরদেহ সাধারণ জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত রাখা হয়নি। যদিও শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানটি টিভিতে সরাসরি সম্প্র্রচারিত হয়েছে।

ইংল্যান্ডে এখন করোনা মহামারিজনিত যেসব বিধিনিষেধ জারি রয়েছে, তার সঙ্গে সংগতি রেখে এই শেষকৃত্যানুষ্ঠানে মাত্র ৩০ জন অতিথি রাখা হয়। তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অতিথিদের তালিকায় ছিলেন রানি এলিজাবেথ ও ডিউক অব এডিনবরার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়রা।

এতে যোগ দেন ডিউকের নাতি প্রিন্স হ্যারিও। যিনি গত বছর রাজপরিবারের সক্রিয় জ্যেষ্ঠ সদস্যের দায়িত্ব ত্যাগ করেছেন। প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যুর পর তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্রিটেনে গেছেন। তবে তার স্ত্রী মেগান সন্তানসম্ভবা থাকার কারণে চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ব্রিটেনে যাননি।

শেষকৃত্যের শুরুতে ডিউক অব এডিনবরার মরদেহ উইন্ডসর দুর্গের প্রাইভেট গির্জা থেকে দুর্গের রাষ্ট্রীয় প্রবেশপথে নিয়ে আসা হয়। এরপর তার মরদেহ একটি জলপাই রঙের ল্যান্ড রোভারে করে উইন্ডসর দুর্গের ভেতরেই সেন্ট জর্জস চ্যাপেল নামের গির্জায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই বিশেষ ল্যান্ড রোভার গাড়িটিই শববাহী গাড়ি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। কারণ প্রিন্স ফিলিপ জীবদ্দশায় নিজে এটি অনেক দিন ব্যবহার করেছেন এবং এটিতে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে তাতেও তিনি নিজে ভূমিকা রেখেছিলেন।

এই গাড়ির পেছনে ছিলেন রানি ও ডিউকের চার সন্তান প্রিন্স চার্লস, এ্যান্ড্রু, এডওয়ার্ড এবং প্রিন্সেস অ্যান। আরো ছিলেন ডিউকের দুই নাতি প্রিন্স উইলিয়াম ও হ্যারি। সঙ্গে ছিলেন পরিবারের অন্য কিছু সদস্য এবং ডিউকের কর্মচারীবৃন্দ। তবে প্রিন্স উইলিয়াম ও হ্যারি পাশাপাশি হাঁটেননি। তাদের মাঝে ছিলেন প্রিন্সেস অ্যানের ছেলে পিটার ফিলিপস। রানি এলিজাবেথ স্বয়ং রাজকীয় বেন্টলি গাড়িতে করে শোভাযাত্রার পেছনে ছিলেন।

উইন্ডসর দুর্গের ভেতরের ঘাসে আচ্ছাদিত চতুষ্কোণ জায়গাটিতে ডিউকের মরদেহ শববাহী গাড়িতে ওঠানো হয়। সেখানে এর আগে থেকেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো ছিল হাউজহোল্ড ক্যাভালরি, ফুট গার্ড এবং ডিউকের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ ছিল এমন সেনা ইউনিটের ছোট কয়েকটি দল। বিকাল পৌনে ৩টায় মূল শোভাযাত্রাটি শুরু হয়। এর শুরুতে ছিল গ্রেনাডিয়ার গার্ড নামে সামরিক বাদক দল। এ সময় দুর্গের ভেতর তোপধ্বনি এবং গির্জার ঘণ্টাধনি করা হয়। ডিউকের মরদেহ তার মর্যাদাসূচক নিজস্ব পতাকা দিয়ে ঢাকা ছিল। তার ওপর ছিল পুষ্পস্তবক এবং ডিউকের নৌবাহিনীর টুপি ও তরবারি। কফিন আবৃত করা হয়েছিল প্রিন্স ফিলিপের ইচ্ছানুসারে এবং ফুলগুলো পছন্দ করেন রানি নিজেই।

সেন্ট জর্জস চ্যাপেলে শোভাযাত্রার সঙ্গে মিলিত হন আর্চবিশপ অব ক্যান্টারবারি—যিনি এ্যাংলিকান চার্চের প্রধান। মূল অনুষ্ঠানে ডিউকের স্মরণে ব্রিটেন জুড়ে এক মিনিটের নীরবতা পালন করা হয়, যা শুরু ও শেষ হয় তোপধ্বনির মধ্যে দিয়ে।

এর পর গির্জার ভেতরে কফিন নিয়ে যাওয়া হয় এবং তা একটি মঞ্চের ওপর রাখা হয়। চার জন সংগীতশিল্পীর একটি দল ডিউকের পছন্দের কয়েকটি গান পরিবেশন করে। এ সময় উইন্ডসরের ডিন ডেভিড কনার প্রিন্স ফিলিপের জনসেবা, দেশ ও কমনওয়েলথের জন্য তার কাজ এবং রানির প্রতি তার বিশ্বস্ততার প্রশংসা করেন। এরপর গির্জার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে ডিউককে সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলের রাজকীয় ভল্টে সমাহিত করা হয়।

করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত স্বাস্থ্যগত বিধিনিষেধের কারণে ব্রিটেনের জনগণকে এই শেষকৃত্যের কোনো অনুষ্ঠানে যোগ না দিতে বলা হয়েছে। অনুরোধ করা হয়, তারা যেন রাজপ্রাসাদের সামনে ফুল ইত্যাদি না দিয়ে বরং ডিউক যেসব দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সেগুলোতে অর্থ দান করেন। তাছাড়া একটি অনলাইন শোকবই খোলা হয় যাতে জনসাধারণ তাদের ব্যক্তিগত বার্তা দিয়ে শোক ও শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। এই শেষকৃত্যানুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে ব্রিটেনে জাতীয় শোক পালন শেষ হলো। তবে রাজপরিবার আরো এক সপ্তাহ ধরে শোক পালন করবে এবং তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সময় তারা কালো পোশাক পরবেন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন :ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন প্রিন্স ফিলিপকে শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিটের নীরবতা পালন করেন। তার অফিশিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্টে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময়কার একটি ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।