অবশেষে আলোচিত হেফাজত নেতা মামুনুল হককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল রবিবার দুপুর ১টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে ইত্তেফাককে জানিয়েছেন মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার হারুন অর রশিদ। মামুনুল ঐ মাদ্রাসার শিক্ষক। তিনি হেফাজতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহনগরের মহাসচিব। ২০২০ সালে মোহাম্মদপুর থানার একটি নাশকতা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এদিকে মামুনুল হক গ্রেফতারের পর ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চট্টগ্রামে পুলিশের নিরাপত্তা আরো জোরদার করা হয়েছে।
জানা গেছে, সাম্প্রতিক তাণ্ডবের পর কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ৩২০ জন নেতাকর্মীকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পুলিশ স্বীকার করেছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৯৮ জন, চট্টগ্রামে ১৫ জন ও ঢাকায় সাত জন। পুলিশ বলছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ২৫৮ জনই হেফাজতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা বা কর্মী। অন্যরা বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তারা হেফাজতের তাণ্ডবে অংশ নিয়েছিল। অন্যদিকে ঢাকায় যে সাত জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে তারা সবাই হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা। আর চট্টগ্রামে গ্রেফতারকৃত ১৫ জনের মধ্যে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী আছেন। যদিও তাকে রিমান্ডে ঢাকায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত পাঁচ নেতা পুলিশের রিমান্ডে আছেন।
তেজগাঁওয়ের উপ-পুলিশ কমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, হেফাজতের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা, থানায় হামলা, রেজিস্ট্রার অফিসে হামলা, ভাঙচুরসহ অনেকগুলো মামলা রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত চলছে। মামুনুল হককে গ্রেফতারের পর তেজগাঁওয়ের উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। পরে তাকে সন্ধ্যায় ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। সোমবার তাকে আদালতে পাঠিয়ে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করবে পুলিশ। তাকে গ্রেফতার করতে গেলে মাদ্রাসার এক দল শিক্ষার্থী পুলিশকে বাধা দেয়। পরে মাদ্রাসার বাইরে থাকা আরও পুলিশ ভেতরে গেলে শিক্ষার্থীরা পিছু হটে। মামুনুল হককে গ্রেফতারের পর কিছু ছাত্র একটি মিছিল বের করার চেষ্টা করে। মিছিলটি মূল সড়কে গেলে পুলিশ তাদের আটকে দেয়।
পুলিশ কর্মকর্তা হারুন বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে মামুনুলকে নজরদারিতে রেখেছিলাম, পাশাপাশি ২০২০ সালে মোহাম্মদপুর থানার একটি ভাঙচুর-নাশকতার মামলা তদন্ত করছিলাম। তদন্তে ঐ ঘটনায় সুস্পষ্ট সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এক প্রশ্নে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। মোহাম্মদপুর থানার মামলা ছাড়াও গাজীপুরের মো. শাহজাহান নামের একজন একই থানায় জিডি করেছেন, সে বিষয়েও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। জিডিতে অভিযোগ করা হয়েছে, শাহজাহানের বোনকে মামুনুল বিয়ে করেছেন। এর পর থেকেই তার বোন নিখোঁজ রয়েছে। এছাড়া অন্য মামলাতেও মামুনুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
গত বছরের নভেম্বরে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে আলোচনায় আসেন মামুনুল হক। এরপর ভাস্কর্য নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ডিসেম্বরে কুষ্টিয়া শহরে জাতির পিতার একটি নির্মাণাধীন ভাস্কর্যে ভাঙচুর চালানো হয়। ভাস্কর্য বিরোধিতা এবং ভাঙচুরের ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী ও যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে।
গত মার্চে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের বিরোধিতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডব চালায় হেফাজত। এর মধ্যে সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে ঢাকায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকায় সংঘাত-নাশকতার ঘটনায় মামুনুল হকসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গত ৩ এপ্রিল সোনারগাঁওয়ের একটি রিসোর্টে এক নারীসহ আটক হয়ে আবারও আলোচনায় আসেন মামুনুল। যাকে তিনি নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেছেন। এ ঘটনায় হেফাজত কর্মীরা সেখানে তাণ্ডব চালায়। ঐ ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। যার প্রতিটিতেই প্রধান আসামি করা হয়েছে মামুনুল হককে। ঐদিন রিসোর্টে ভাঙচুরের অভিযোগে ৮৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়। এছাড়া ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। মামলায় সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ এনে ৪১ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাত ২৫০-৩০০ জনকে আসামি করা হয়। এছাড়া যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে আরেকটি মামলাটি করা হয়। এ মামলায় ৪২ জনের নাম উল্লেখ ও ২৫০-৩০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
এর আগে হেফাজতের আট কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত ১১ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-অর্থ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগরী কমিটির সহসভাপতি মুফতি ইলিয়াসকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর ১৩ এপ্রিল হেফাজতের কেন্দ্রীয় সহ-প্রচার সম্পাদক মুফতি শরীফ উল্লাহ, ১৪ এপ্রিল সহকারী মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি ও কেন্দ্রীয় নেতা সাখাওয়াত হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। সর্বশেষ গত ১৬ এপ্রিল মাওলানা যুবায়ের আহমেদ ও ১৭ এপ্রিল জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমেদ নামে হেফাজতের দুই কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।
সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে রয়েল রিসোর্টে মামুনুল হক নারীসহ অবরুদ্ধের পর হেফাজতের ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মামলায় পৌর কাউন্সিলর ফারুক আহমেদ তপনকে গ্রেফতার করেছে পুুুুলিশ। তিনি সোনারগাঁও পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ঐ মামলার আসামি। গত শনিবার রাত সাড়ে ১২টায় উপজেলার ভবনাথপুর এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। তিনি সোনারগাঁও পৌরসভা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
