বাক্শক্তির যথাযথ ব্যবহার কাম্য

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২১, ২২:০৩

কথা বলা মানুষের জন্মগত অধিকার। প্রাত্যহিক চাহিদা পূরণে মানুষকে কথা বলিতে হয়। কথার মাধ্যমে মানুষ প্রকাশ করে তাহার মনের ভাব ও অভিব্যক্তি। কিন্তু অনেক সময় মানুষের বাক্শক্তির অপব্যবহার পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বহিয়া আনে অকল্যাণ। বিপর্যয়ের কারণ ঘটায় জিহ্বার অবিচেনাপ্রসূত ও অযথাযথ ব্যবহার। অধিক কথা বলিতে গিয়া সম্প্রতি দুই জন রাজনীতিক বিপদে পড়িয়াছেন। একজন গিয়াছেন শ্রীঘরে। অন্যজনকে লইয়া খোদ নিজ দলেই উঠিয়াছে সমালোচনার ঢেউ। কটাক্ষ করিয়া কোনো কথা বলিতে হইলে স্থান-কাল-পাত্রভেদে বলা বাঞ্ছনীয়। যেইখানে-সেইখানে কটাক্ষ করিলে তাহা সমূহ বিপদের কারণ হইতে পারে। এই জন্য কথা বলিবার ক্ষেত্রে আমাদের যথাসম্ভব সতর্ক ও সংযমী হওয়া প্রয়োজন। কথা যত কম বলা যায়, ততই মঙ্গল। কোনো কিছু বুঝানো বা ব্যাখ্যা করিবার জন্য কথা একটু অধিক বলিতে হইতে পারে। কিন্তু তাহাও হইতে হইবে যথাযথ ও টু দ্য পয়েন্টে বা প্রাসঙ্গিক বিষয়ে। কোনো অস্পষ্ট বিষয় স্পষ্ট করা অথবা জাস্টিফাই বা বিবেচনার জন্য দুইটা কথা অধিক বলিতেই হয়।

সমস্যা হইল আমরা বাঙালিরা অভ্যাসগত কারণেই কম কথা বলিতে পারি না। এই জন্যই হয়তো এইখানে মোবাইল কোম্পানিগুলি দেদার ব্যবসা করিয়া যাইতেছে! আবার যাহারা অধিক কথা বলেন, তাহারা কখনো বুঝিতেই পারেন না যে, তাহারা অধিক কথা বলেন। এইরূপ অধিক কথা বলা বা অপ্রয়োজনীয় কথা মানুষের মনে তৈরি করে বিরক্তি। পক্ষান্তরে কম কথা বলিবার উপকারিতা হইল, যাহারা কম কথা বলেন, তাহারা চিন্তা করিতে পারেন অধিক। তাহারা তাহাদের এনার্জির বাকি অংশ ব্যয় করিতে পারেন গঠনমূলক কাজে। এএআরসি ম্যাগাজিনে বলা হইয়াছে, ‘কম কথা বলিবার বিষয়টি মস্তিষ্কের জন্য ভালো। ইহাতে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা সঠিক থাকে এবং কোনো কথা বলিবার পূর্বে চিন্তা করিয়া নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।’ তবে কম কথা বলিবার লোক দুই রকমের। ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকা’র একটি ইন্টারভিউয়ে ‘কোয়াইট :দ্য পাওয়ার অব ইনট্রোভার্টস’-এর লেখক সুসান কেইন বলিয়াছেন, ‘অন্তর্মুখী বৈশিষ্ট্য ও লজ্জার কারণে চুপ থাকিবার মধ্যে পার্থক্য রহিয়াছে। যাহারা লজ্জা পান তাহারা নিজের কথার বিপরীতে নেতিবাচক কোনো কিছুর ব্যাপারে কথা শুনিতে লজ্জিত বোধ করেন বলিয়াই চুপ থাকেন। কিন্তু যাহারা অন্তর্মুখী স্বভাবের তাহারা অন্যের কথা শুনিয়া তাহা লইয়া ভাবিতে ও শিক্ষা গ্রহণেই অধিক ব্যস্ত থাকেন।’

যে অধিক কথা বলে তাহাকে বলা হয় বাচাল। আর বাচালের পদে পদে বিপদ অপেক্ষা করে। এই জন্য হাদিসে বলা হইয়াছে, যে চুপ থাকে সে মুক্তি পায়। এই দৃষ্টিতে বলা যায়, যিনি চুপ থাকেন বা কম কথা বলেন তিনি বুদ্ধিমান। মানুষ অধিক কথা বলে কখন? মিথ্যা কথা বলা, কাহারও গিবত করা, নিজের বড়ত্ব বা অহমিকা প্রকাশ করা, কাহাকে অভিশাপ দেওয়া বা গালিগালাজ করা, অহেতুক তর্কে লিপ্ত হওয়া, অতিরিক্ত হাসিঠাট্টা করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অধিক কথার অবতারণা করিতে হয়। এই সকল কাজ নিন্দনীয়ও বটে। তাই টমাস এডিসন বলিয়াছেন, ‘একজন মানুষ তখনই চমত্কার ব্যক্তিত্বের অধিকারী হইতে পারে, যখন সে অনর্থক কথা বলা ও অপকর্ম হইতে বিরত থাকে।’ অতএব, বুঝিয়া শুনিয়া ও স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করিয়া আমাদের কথা বলিতে হইবে। অধিক কথা বলা যায়। তবে তাহা হইতে হইবে সত্য ও যুক্তিযুক্ত। কেননা অধিক কথা বলিবার পরিণাম ভয়াবহ। রসুলুল্লাহ (স.) বলিয়াছেন, বান্দা যখন ভালোমন্দ বিচার না করিয়াই কোনো কথা বলে, তখন তাহার কারণে সে নিজেকে জাহান্নামের এতদূর গভীরে লইয়া যায় যাহা পূর্ব ও পশ্চিমের সমান (বুখারি ও মুসলিম)।