বিশ্ব জুড়ে করোনার প্রাদুর্ভাবে জনজীবন বিপন্ন। বিগত এক বছর ধরেই চলছে করোনার ভয়াবহতা। বিশ্বের শক্তিশালী উন্নত রাষ্ট্রগুলোও থমকে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। একের পর এক সংক্রমণ বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়েছে সর্বক্ষেত্রে। করোনা মহামারির এক বছরে মাঝে কিছু সময় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও এ বছরের মার্চ থেকে আবার শুরু হয়েছে করোনার ভয়াল থাবা। একটি উদ্বিগ্ন আর সংকটাপন্ন মুহূর্তে সরকার সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা করেছে। ১৮ দফা নির্দেশনা সংবলিত এই লকডাউন মানার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনীহা দেখা গেছে। কিছুদিন আগেও থানা, উপজেলা পরিষদে হামলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভে নেমেছিলেন ব্যবসায়ীরা। পরে কয়েক দিনের জন্য শপিংমল খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু কেন লকডাউন মানতে অনীহা? কোন কারণে এমন কঠিন সময়েও মানুষ লকডাউন মানতে দ্বিধা করছে? এমন প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে আমাদের একটু চোখ মেলে উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাতে হবে। বিশ্বের যেসব রাষ্ট্র লকডাউনে যাচ্ছে, তারা কোন ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করছে, সেদিকে দৃষ্টিপাত করা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই সর্বোচ্চ মাত্রায় থাকায় দেশটির সরকার লকডাউন ঘোষণা করেছিল। সেদেশের নাগরিকেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধনী হওয়া সত্ত্বেও মাসিক ২ হাজার ডলার করে ভাতা প্রদান করছে সরকার। একইভাবে পাশের দেশ কানাডায়ও একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়। বিগত এক বছর ধরে জনগণকে এভাবে ভাতা দিয়ে আসছে সেদেশের গভর্নমেন্ট। আরব আমিরাতে সংক্রমণ রোধে মাসখানেক আগে গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এছাড়া বিশ্বের বহু উন্নত রাষ্ট্রে করোনা নিয়ন্ত্রণে যথাযোগ্য পদক্ষেপ নিলেও রাষ্ট্রের নাগরিকেরা কষ্টের বেড়াজাল থেকে মুক্ত। সেসব দেশের জনগণের খাবারের ব্যবস্থা, জনজীবনে সংকট নিরসনের পদ্ধতি হাতে নিয়ে তারপর লকডাউনে যাচ্ছে সরকার।
কিন্তু আমাদের প্রিয় স্বদেশের চিত্র ভিন্ন কেন? কতটা ক্ষুধার্ত আর ক্ষিপ্ত হলে মানুষ অবাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমে আসে? তা-ও আবার মহামারির এরকম ভয়ানক পরিস্থিতিতে! অথচ আমাদের তো কোথাও কমতি দেখছি না।
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৪৪ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এই রিজার্ভ যদি দুর্যোগ বা মহামারিতে দেশের মানুষের কাজে না লাগে, তাহলে তা কীসের জন্য? করোনায় দেশের অসচ্ছল জনগণকে উন্নত রাষ্ট্রের মতো ১০ হাজার টাকা করে ভাতা দিলে এই জনগণ আগামী দিনে দেশকে ১০ লক্ষ টাকা করে ফিরিয়ে দিতে পারে—এ কথা যে কেউ বুকে হাত রেখে বলতে পারবে। দেশে শুধু রিজার্ভ নয়, রেমিট্যান্সেও শীর্ষ দশে রয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের জিডিপিতে ১২ শতাংশের বেশি অবদান রাখছে।
এত কিছুর পরেও মনে হয় না আমাদের কোনো কিছুর কমতি আছে, আমরা কোনো দিক দিয়ে পিছিয়ে আছি। আমাদের যথেষ্ট আছে। এর পরও মানুষ কেন লকডাউনের মতো কঠোর বিধিনিষেধ ভঙ্গ করতে যাবে? তাদের ক্ষুধা মেটানো কি সরকারের পক্ষে অসম্ভব কিছু? না, মোটেও অসম্ভব নয়। প্রয়োজন শুধু ইচ্ছাশক্তির।
গত বছরেও করোনার কারণে সবকিছু বন্ধ ছিল। ব্যবসায়ীরা রমজানের জমজমাট বেচাবিক্রি থেকে বঞ্চিত হয়েছে, খেটে খাওয়া দিনমজুরেরা কর্মহারা হয়ে পেটে পাথর বাঁধার উপক্রম হয়েছিল। এ বছরও ঠিক রমজানের আগে লকডাউনে ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত, শ্রমিকদের চোখে অশ্রু ঝরছে। এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না। ব্যবসায়ী, খেটে খাওয়া মানুষসহ সব নাগরিকের কথা চিন্তা করে তারপর লকডাউনের মতো সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত ছিল। যে লকডাউন দেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য, সেই লকডাউনেই যদি দেশের মানুষ না খেয়ে মরে, তাহলে তা অনর্থক এবং ভুল সিদ্ধান্ত।
n লেখক :শিক্ষার্থী, দারুন্নাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, ঢাকা
