উয়েফাকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প টুর্নামেন্ট সুপার লিগ আয়োজনের উদ্যোগ

সংকটে ইউরোপিয়ান ফুটবল

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২১, ২২:২৫

 স্পোর্টস ডেস্ক

এতদিন স্রেফ গুঞ্জন হিসেবেই ধরা হচ্ছিল ইউরোপিয়ান সুপার লিগের কথা। তবে সমস্ত জল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে রবিবার শেষ রাতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলো বিদ্রোহী লিগের খেতাব পাওয়া এই ফুটবল টুর্নামেন্টের। আগামী আগস্ট থেকে ২০ দল নিয়ে এই টুর্নামেন্ট শুরু করতে চলেছে আয়োজকরা। প্রাথমিক চুক্তি ২৩ বছরের জন্য। এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাতা ক্লাব হিসেবে ইউরোপের শীর্ষ ১২ ক্লাব সুপার লিগে নাম লিখিয়েছে। সেই ১২টি ক্লাব একত্রে বিবৃতি দিয়ে জানায়, প্রস্তাবিত ইউরোপিয়ান সুপার লিগে তারা যোগ দিতে যাচ্ছে।

এক যুগ আগে ২০০৯ সালে আর্সেনালের তত্কালীন ম্যানেজার আর্সেন ওয়েঙ্গার শঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো জোট বেঁধে আলাদা একটা লিগের আয়োজন করতে পারে। যা পুরো ফুটবল বিশ্বের চেহারাই পাল্টে দেবে। মাঝে বিষয়টি একদম ধামাচাপা পড়ে গেলেও, করোনা মহামারির মধ্যে নতুন করে তত্পর হয় ওই জোট। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ। তার মাথা থেকেই আরো দশক দুয়েক আগে এই বুদ্ধি এসেছিল। তাকেই তাই প্রথম সুপার লিগের সভাপতি বানানো হয়েছে।

পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে না পারাতেই এতদিন আলোর মুখ দেখেনি ইউরোপিয়ান সুপার লিগ। তবে করোনায় বড় ক্লাবগুলো আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখ দেখায় আঁটসাঁট বেঁধে নামেন পেরেজ। তাতে তিনি সফলও। নিদারুণ অর্থেও ঝনঝনানি টের পেয়ে তার সঙ্গে একাত্মতা দেখিয়েছে নামিদামি ক্লাবগুলো। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ থেকে বিদ্রোহী লিগে নাম লিখিয়েছে ইউনাইটেড, সিটি, লিভারপুল, চেলসি, আর্সেনাল ও টটেনহাম। সেরি আ থেকে এসি মিলান, ইন্টার মিলান এবং জুভেন্টাস। আর লা লিগা থেকে রিয়াল মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনার সঙ্গে এই লিগে নাম লিখিয়েছে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ।

প্রতিষ্ঠাতা ক্লাব হিসেবে জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ, ফ্রান্সের প্যারিস সেইন্ট জার্মেইকে (পিএসজি) আমন্ত্রণ দিয়েছে রেখেছে পেরেজবাহিনী। শেষ মুহূর্তে চমক হিসেবে ঢুকে যেতে পারে পর্তুগিজ ক্লাব পোর্তো, জার্মান ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ড কিংবা রেডবুল লাইপজিগ। প্রতিষ্ঠাতা ১৫ ক্লাবের সঙ্গে আমন্ত্রিত আরো পাঁচ ক্লাবকে নিয়ে দুটি গ্রুপে ভাগ করে রাউন্ড রবিন লিগে চলবে এই টুর্নামেন্ট। পরে দুই লেগের কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল শেষে ফাইনাল। এই হলো টুর্নামেন্টের কাঠামো। সুপার লিগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠাতা ক্লাব নিজেদের ঘরোয়া জাতীয় লিগগুলো খেলার পাশাপাশি সপ্তাহের মাঝে নতুন এই প্রতিযোগিতায় খেলবে।

তবে ফিফা এবং উয়েফা সুপার লিগের ঘোরবিরোধী। তাদের নাকের ডগার সামনে দিয়েই, তাদের অনুমতি ছাড়াই সুপার ক্ষমতার দলগুলো বিদ্রোহের পথে যাওয়ায় বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা আর ইউরোপীয় ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই ক্লাবগুলো যদি ইউরোপীয় সুপার লিগ আয়োজন করে বা তাতে অংশ নেয়, তাহলে তারা উয়েফার সব ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের অধিকার হারাবে। কেবল তা-ই নয়, এই লিগে অংশ নেওয়া কোনো ফুটবলারকে নিজ নিজ দেশের জাতীয় দল থেকেও নিষিদ্ধ করা হবে।

তবে সুপার লিগের যাত্রা হয়তো আটকাতে পারবে না ফিফা কিংবা উয়েফার মতো নীতি-নির্ধারক সংস্থা। কারণ, ইতোমধ্যেই এই সুপার লিগে ৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। আর লিগে প্রতিষ্ঠাতা ক্লাব হিসেবে যুক্ত হলেই পাওয়া যাবে ৩.৫ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৩৫ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা)। করোনার কারণে যেখানে মারাত্মক ক্ষতির মুখে ক্লাবগুলো, সেখানে বিদ্রোহ করে হলেও এতোগুলো টাকা কেই বা না পেতে চাইবে!

হঠাত্ কেন এই ঘোষণা

ইউরোপিয়ান সুপার লিগের ঘোষণা এসেছে একদম সময় সুযোগ বুঝেই। গতকাল উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের বর্তমান ফরম্যাট সংস্করণ নিয়ে আলোচনায় বসার কথা ছিল। যেখানে বর্তমানের ৩২ দলের ফরম্যাট থেকে ৩৬ দলের প্রতিযোগিতায় উন্নীত করার কথা ছিল উয়েফার। তাতে লোকসান গুনতে হতো মূলত বড় দলগুলোকেই। আসওে অংশগ্রহণকারী দল বাড়াতে মূলত ছোট দলগুলোকে সুযোগ করে দেয়ার কথা ভেবেছিল উয়েফা। আর ছোট দলগুলোর বিপক্ষে খেললে লাভ কম হয় নামিদামি ক্লাবগুলোর। টিভি সত্ত্বের ওপরেও পড়ে যার প্রভাব।

যে কারণে এই টুর্নামেন্ট

সুপার লিগের মূল উদ্দেশ্যেই অধিক অর্থ উপার্জন। ইউরোপের প্রথিতযশা ক্লাবগুলো এক হয়ে একটি লিগে খেলতে পারলে প্রতিনিয়ত বিগ ম্যাচ আয়োজন করা সম্ভব হবে। ফলে দর্শক চাহিদায় অর্থকড়িতে ফুলেফেপে উঠবে ক্লাবগুলো। চ্যাম্পিয়নস লিগে অনেক নতুন দলের উত্থানে ইউনাইটেড, মিলান, আর্সেনালের মতো জনপ্রিয় দলগুলো এখন অনেকটা রঙ হারিয়েছে। মাঝেসাঝে জায়গা হয় ইউরোপ সেরার মঞ্চে। ফলে দলগুলোর টিভি স্বত্ব, স্পনসরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা লাভের মুখ দেখছে না। সুপার লিগে নিয়মিত খেলা নিশ্চিত হলে, বিশ্বব্যাপী দলগুলোর যে ব্যাপক দর্শক চাহিদা, তা কাজে লাগিয়ে প্রচুর আর্থিক উন্নতি করা সম্ভব।

বিপুল অর্থের হাতছানি

আর্থিক বিষয় নিয়ে আয়োজকেরা জানিয়েছে, বর্তমান ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতার তুলনায় বেশি অর্থ আয় করবে অংশ নেওয়া দলগুলো। টুর্নামেন্টে প্রতিষ্ঠাতা ক্লাব হিসেবে অংশ নিলে করোনার আঘাত কাটিয়ে নিজেদের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পাওয়া যাবে ৩.৫ বিলিয়ন ইউরো। এ ছাড়াও চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী দল এখন যে প্রাইজমানি পেয়ে থাকে, সেখানে সুপার লিগের শীর্ষ ছয় দল মৌসুমে ৩৫ কোটি ইউরো পাবে, যা বর্তমান চ্যাম্পিয়নস লিগ বিজয়ী দলের (প্রায় ৮ কোটি ইউরো) চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি।

সুপার লিগের ধারণা

১৯৯৮ সালে ইতালিয়ান মিডিয়া কোম্পানি পার্টনাররা সুপার লিগের ধারণা বের করেছিলেন। কিন্তু উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ বড় করে আয়োজন করায় সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন করা যায়নি। এরপর ২০০৯ সালে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ আবারো তোলেন সুপার লিগের কথা। পেরেজের প্রস্তাব ছিল—ইউরোপের শীর্ষ সারির ক্লাবগুলো নিজস্ব একটা লিগের ব্যাপারে একমত হওয়া উচিত, যেখানে সেরা ক্লাবগুলো নিয়মিত খেলতে পারবে। হয় উয়েফা ব্যবস্থাটা করে দিক কিংবা নামিদামি ক্লাবগুলো নিজেরাই সেই টুর্নামেন্ট আয়োজনে এগিয়ে আসুক।

যেভাবে চলবে টুর্নামেন্ট

দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে ১০টি ক্লাব একে অপরের বিরুদ্ধে খেলবে। হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে ভিত্তিতে ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে। প্রতি গ্রুপ থেকে শীর্ষ তিন দল উঠবে কোয়ার্টার ফাইনালে। বাকি দুটি স্থানের জন্য দুটি গ্রুপের চতুর্থ ও পঞ্চম দল দুই লেগের প্লে-অফ ম্যাচ খেলবে। বাকিটা আগাবে চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো। কোয়ার্টার ও সেমিফাইনাল হবে দুই লেগের ভিত্তিতে।

পিএসজি ও বায়ার্ন কেন যোগ দেয়নি?

পিএসজি সরাসরিই বলেছে, তারা এই প্রজেক্টে আগ্রহী নয়। পিএসজির মালিক নেসার আল খেলাইফি আবার উয়েফার বিভিন্ন পদের দায়িত্বে আছেন। সেই হিসেবেও তিনি লিগের বিপক্ষে থাকবেন। আর জার্মান ক্লাবগুলোর সিংহভাগ শেয়ার যেহেতু ফ্যানদের কাছে, তারা চাইলেই চট করে এই লিগে নাম লেখাতে পারবে না। সে জন্য বায়ার্ন বা ডর্টমুন্ড এখনো কিছু বলেনি।

সুপার লিগের নেপথ্যে যারা

এই লিগের মূল কারিগর হিসেবে ধরা হচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজকেই। তিনি এই লিগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সহসভাপতি হিসেবে জুভেন্টাসের আগ্নেলির সঙ্গে আরো আছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সভাপতি জোয়েল গ্লেজার, লিভারপুলের জন ডব্লিউ হেনরি, আর্সেনালের স্ট্যান ক্রোয়েংকে।