দুনিয়াজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নির্ণয়ে বিশ্বেরও বেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও বিশেষভাবে সমাদৃত তিনটি র্যাঙ্কিং হচ্ছে কিউএস (কোয়াককোয়ারেল সিমন্ডস), টাইমস হায়ার এডুকেশন এবং সাংহাইভিত্তিক একাডেমিক র্যাঙ্কিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ। বলাবাহুল্য, প্রতিষ্ঠানগুলোর র্যাঙ্কিং পদ্ধতি ও নির্ণায়কগুলোর যৎসামান্য পার্থক্য থাকলেও লক্ষ্য এক। অর্থাৎ আপেলকে কমলার সঙ্গে তুলনা না করে সুনির্দিষ্ট নির্ণায়কের ভিত্তিতে বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা/গবেষণার মান নিরূপণ। যেহেতু সব প্রতিষ্ঠানকে এক নিক্তিতে মাপা হয় তাই রেংকিং থাকলে গবেষক/শিক্ষার্থীদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ। অন্যদিকে শিক্ষার্থী/গবেষকের আকৃষ্ট করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক অবস্থানকে বিপণনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। তাই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাঙ্কিং নানা কারণে অর্থবহ।যেমন, বৃত্তি প্রদানকারী দেশ/সংস্থাগুলো উচ্চশিক্ষায় বৃত্তি প্রদানে প্রার্থীর স্নাতক প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক অবস্থান বিবেচনা করে। কেননা, স্বতঃসিদ্ধ একটা তত্ত্ব হচ্ছে- স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের স্নাতকগণ মেধাবী ও দক্ষ।
বৈশ্বিক অবস্থান সম্মানজনক হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক বা শিল্পভিত্তিক গবেষণা ফান্ড পেতেও ব্যাপক সুবিধা হয়। দেশে প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ প্রদানে এখন টাইমস র্যাঙ্কিং অনুসরণ করে। গুরুত্বের বিবেচনায় উন্নয়নশীল অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বিশ্বের খ্যাতনামা গবেষকদের আকর্ষণীয় প্রণোদনার মাধ্যমে নিজস্ব একাডেমিকদের সঙ্গে কাজের সেতুবন্ধ তৈরি করে। একটা উইন-উইন পরিস্থিতির তৈরী হয় ফলে দুই পক্ষই লাভবান হয়। ধরুন, আমেরিকার একজন বাংলাদেশ নিয়ে গবেষণা করবে। এক্ষেত্রে সে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত হলে কাজে যেমন সুবিধা হয় তেমনি দেশের সংস্থাটি নানাভাবে উপকৃত হয়। অর্থাৎ তার কাজও হল সাথে দুই প্রতিষ্ঠানের একাডেমিকদের তথ্য বিনিময়সহ বহুবিধ সুবিধা হয়। আবার র্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে তারা পারস্পরিক সহযোগিতার উপর নির্দিষ্ট পয়েন্ট অর্জন করে। মোদ্দাকথা, দেশীয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাই করুক না কেন র্যাঙ্কিংয়ের এগুলোর (গবেষণা সহযোগিতা, একাডেমিক সুনাম ইত্যাদি) অবদান তাৎপর্যবহ।
২০২১ সালের কিউএস এবং টাইমস র্যাঙ্কিং অনুসারে শতবর্ষী বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অবস্থান ১০০০+। দুৰ্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, দেশের শতাধিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটিও ২০২১ সালের রেংকিংয়ে শীর্ষ হাজারে নেই। আরো হতাশার যে টাইমস রেংকিং অনুযায়ী ঢাবির; অবস্থান ২০১৬ থেকে নিম্নগামী অর্থাৎ ২০১৬-এর অবস্থান ৬০১-৮০০ থেকে বর্তমানে ১০০০+। না থাকার কারণও আছে। যেমন প্রতিষ্ঠানটি শুরু হয়েছিল স্নাতক তৈরির লক্ষ্যে যা অদ্যাবদি প্রচলিত। বর্তমান উপাচার্যও তাই বলেছেন (সমকাল, ২১ জানুয়ারি ২০২১)। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বা আধুনিক ল্যাবের অভাবতো আছেই। উপরন্তু, প্রতিষ্ঠানটিকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দায়িত্ব নিতে হয়েছে, স্বাভাবিকভাবে শিক্ষাও বিঘ্নিত হয়েছে। অনুরূপভাবে, গণতান্ত্রিক চর্চা শুরু থেকে অদ্যাবদি বিদ্ধেষ ও বিভাজনের রাজনীতি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ও গবেষণাকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করছে তেমনি তৈরী হয়েছে দল, উপদল ফলে নিয়োগ, পদোন্নতিসহ সবকিছুতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ দৃশ্যমান (জাগোনিউজ, ২০ ফেব্রূয়ারি ২০২১)। তাই, কলেবরে বাড়লেও গুণেমানে নিম্নগামী (প্রথম আলো, ২০ অক্টোবর ২০২০)।

সর্বোপরি, মনোজগতের দৈন্যতাও কি কম দায়ী? আদর্শিক রাজনীতির অনুপস্থিতিতে পাল্লা দিয়ে কমছে শিক্ষার মান, ভুলুন্ঠিত হচ্ছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কল্যান। খবরে প্রকাশ, ঢাবি পনেরো বছর মেয়াদি ১০,০০০ কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা নিচ্ছে যার বেশিরভাগ ব্যয় হবে অবকাঠামো বা বিল্ডিং নির্মাণে (টিবিএস, ১২ ফেব্রূয়ারি ২০২১)। জনশ্রুতি আছে, বারাক ওবামা ২০০৮ এ প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বিশ্বখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিকে (এমআইটি) পুরোনো বিল্ডিংগুলো ভেঙ্গে নতুন বিল্ডিং নির্মাণে বড় ফান্ড দিতে চাইলে এমআইটি কতৃর্পক্ষ নিতে অপারগতা জানায়। স্পষ্ট বলে যদি গবেষণাখাতে ব্যয়ের অনুমতি থাকে তবে বিবেচনা করবে, শেষাব্দি হয়ও তাই। গবেষণায় সক্ষমতা বাড়ালে অন্যসব কিন্তু আপনাআপনি হয়। কারণ বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ শিল্পভিত্তিক কর্মকাণ্ড বাড়ার লক্ষ্যে অবকাঠামো নির্মাণে বেশি আগ্রহী হয়। বৈশ্বিক রেংকিংয়ের বাস্তবতায়, ঢাবি কতৃর্পক্ষ বিশেষ আলোচ্যসূচি-২ এ ৩১শে জানুয়ারি ২০২১-এর একাডেমিক পরিষদে বিদেশী গবেষকদের সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠানটির প্রাক্তন শিক্ষার্থী/শিক্ষকদের অগ্রাধিকারের প্রস্তাব রয়েছে তথাপিও অস্পষ্টতা বিদ্যমান। যেমন গবেষক/শিক্ষক আমন্ত্রণের পদ্ধতি কি হবে তা সংজ্ঞায়িত নেই।
পেশাগত কারণে উন্নতদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে গবেষণা সহযোগিতা ও পিএইচডি তত্ত্বাবধানের অভিজ্ঞতায় দেখি তাদের নিয়মকানুন লিখিত ও সুনির্দিষ্ট। ইচ্ছা করলে কেউ সুবিধা দিতে বা নিতেও পারবে না। যদিও ঢাবির কার্যবিবরণীটির সিদ্ধান্তে বেতন/সম্মানী প্রদান ও আবাসনের; সুযোগ; বিধৃত আছে তবে অর্থনৈতিক দিকটি অপরিষ্কার। বলাবাহুল্য, আমাদের যে কোনো কিছু শুরু চমকপ্রদ কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও নিয়মের অস্পষ্টতা, গোড়া থেকে, থাকলে লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন। বাস্তব উদহারণ হচ্ছে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ। অধ্যাদেশটিতে শিক্ষা ও গবেষণার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি থাকলেও গবেষণা যেমন কম তেমনি হালনাগাদের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে জটিল সমস্যার উদ্রেক হয় বলে মাঝে মাঝেই গণমাধ্যমে খবর আসে। যাক, একাডেমিক পরিষদের সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নকল্পে নিয়মনীতির স্পষ্টতা নিশ্চিত করলে অপব্যবহার যেমন হ্রাস পাবে তেমনি অর্থের অপচয় কমবে। প্রযুক্তির বদৌলতে বিশ্বের যে কোনো গবেষকের কৃতিত্ব এখন সহজেই নিরুপন সম্ভব তাই বিজ্ঞানী/শিক্ষক আমন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত এইচ-ইনডেক্স (h-index) বিবেচনায় নেওয়া যায়। এমন আরো ইনডেক্স রয়েছে যেগুলো কাজে লাগতে পারে। সিদ্ধান্তটা সম্ভবতঃ সকলের জন্য উন্মুক্ত তবুও শাস্রভিত্তিক অগ্রাধিকার থাকলে তুলনামূলকভাবে নতুন বিভাগগুলো উদ্যোগটির সুফল পাবে।
পরিশেষে, আমন্ত্রিত গবেষকের সুবিধাদি (আবাসন ও অন্যান্য) নির্দিষ্ট থাকলে বিদেশি গবেষকগণ কর্মরত প্রতিষ্ঠানকে জানাতে পারেন। কেননা, উন্নতদেশের কোনো গবেষক অন্যদেশে গবেষণা/শিক্ষকতা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পূর্বে কর্মরত প্রতিষ্ঠানকে এসব তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক। উদ্যোগটি যাতে কেউ নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে বা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে না পারে তাই সিদ্ধান্তটির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ জরুরি। নতুবা অনেকে স্বপ্রয়োজনে ব্যবহার করে ভালো এই উদ্যোগটির গন্তব্য অনিশ্চিত করতে তুলতে পারে। যেহেতু দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন বিষয়ে ঢাবিকে অনুকরণ করে সেহেতু গুণগত ও জবাবদিহি ব্যবস্থা ব্যতীত বৈশ্বিক রেঙ্কিংয়ে উন্নয়নের পথ বন্ধুর। তাছাড়া, দেশের প্রেক্ষিতে ঢাবির সাথে জড়িত লাখ-কোটি প্রাক্তন ও বর্তমান স্নাতকদের অনুভূতিও। ঢাবির গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে ফিরিয়ে আনতে ও বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিতে রাষ্ট্রকেই তাই সম্মুখযোদ্ধার ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখক: স্কুল অব আর্থ এন্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস, কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া।
ইত্তেফাক/কেকে
