বিয়ের জন্য চাপ দেওয়াতেই প্রেমিকা ননিকাকে হত্যা করে পুলিশ কনস্টেবল নিমাই

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২১, ২১:৪১

আনিসুজ্জামান, স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী

রাজশাহীতে ড্রামের ভেতর থেকে উদ্ধার করা তরুণী ননিকা রাণী রায়ের (২২) পরিচয় মিলেছে। তিনি পেশায় একজন নার্স। পুলিশ কনস্টেবল প্রেমিকই তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশ গুমের উদ্দেশ্যে ফেলে রেখে গিয়েছিল। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ছায়া তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। ননিকা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ কনস্টেবল নিমাই চন্দ্র সরকার (৪৩)সহ চার জনকে গ্রেফতার করেছে রাজশাহী পিবিআই।

জানা যায়, ননিকার বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মিলনপুর গড়েয়া গ্রামে। বাবার নাম নিপেন চন্দ্র বর্মণ। রাজশাহী নার্সিং ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা করেছেন। চাকরি নিয়েছিলেন একটি ক্লিনিকে। এরই মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে রেলওয়ে পুলিশের কনস্টেবল নিমাই চন্দ্র সরকারের সঙ্গে। অবিবাহিত নার্স ননিকা রায় বিবাহিত পুলিশ কনস্টেবল নিমাইয়ের সঙ্গে ছয়-সাত বছরের প্রেমের সম্পর্কের জেরে সম্প্রতি স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে নগরীর তেরখাদিয়া এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। সেখানে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ায় নিমাই পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ননিকাকে। গ্রেফতার তিন সহযোগী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তবে ধূর্ত কনস্টেবল নিমাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়নি। আদালতের মাধ্যমে তাকে পাঁচ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।  

পিবিআই রাজশাহীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আযাদ জানান, কনস্টেবল নিমাই পাবনার আতাইকুলা উপজেলার চরাডাঙ্গা গ্রামের মৃত হেমান্ত সরকারের ছেলে। নিমাই রাজশাহীতে রেলওয়ে পুলিশে সাত বছর ধরে কর্মরত। গত ৬ এপ্রিল নগরীর তেরখাদিয়া এলাকায় স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে একটি ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন নিমাই ও ননিকা। এরপর গত শুক্রবার সকালে নগরীর উপকণ্ঠ সিটিহার্ট এলাকার ডোবা থেকে অজ্ঞাত হিসেবে ননিকার লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশটি ছিল একটি চালের ড্রামের ভেতর। এ ঘটনায় নগরীর শাহ্ মখদুম থানায় অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। নগরীর শাহ্ মখদুম থানা পুলিশ ঘটনাটির তদন্ত শুরু করে। পাশাপাশি ছায়া তদন্ত করছিল পিবিআই। পিবিআইয়ের তদন্তে এই তরুণীর পরিচয় উদ্ঘাটনের পাশাপাশি ঘাতকদের গ্রেফতার ও হত্যার ক্লু উদ্ঘাটন করেন তারা।

হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার অন্যরা হলেন—রাজশাহী মহানগরীর কাশিয়াডাঙ্গা থানার আদারীপাড়া মহল্লার জয়নাল আবেদীনের ছেলে কবির আহম্মেদ (৩০), রাজপাড়া থানার বিলসিমলা এলাকার সতীশ রায়ের ছেলে আব্দুর রহমান (২৫) এবং শ্রীরামপুর টি-বাঁধ এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে সুমন আলী (৩৪)। আব্দুর রহমান মাইক্রোবাসের চালক, তিনি আগে হিন্দু ছিলেন। তখন তার নাম ছিল সঞ্জয় রায়। তার মাইক্রোবাসে করেই লাশ ফেলে আসা হয়েছিল সিটি বাইপাস সড়কের ঐ ডোবায়।

পিবিআইয়ের ঐ পুলিশ কর্মকর্তা আরো জানান, নিমাই বিবাহিত। তার স্ত্রী বুলবুলি রাণী দাস, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে কর্মরত। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকায় একটি সন্তান নিয়ে বুলবুলি রাণী আলাদা থাকেন। এই সুযোগে গত ৬ এপ্রিল প্রেমিকা ননিকাকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া করেছিলেন নিমাই। ননিকা তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। এ কারণেই তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। তিনি আরো বলেন, হত্যার সময় নিমাইয়ের বন্ধু কবির আহম্মেদ ও সুমন আলী ননিকার হাত-পা চেঁপে ধরেছিলেন। আর নিমাই গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করেন। পরে বাজার থেকে চাল রাখার একটি ড্রাম কিনে আনেন। সেই ড্রামে লাশ, বালিশ ও কম্বল ঢুকিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে সেটি নির্জন ডোবায় ফেলে আসা হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানায়, ননিকা নগরীর পাঠানপাড়া এলাকার একটি ছাত্রীনিবাসে থাকতেন। পুলিশ কনস্টেবল নিমাইয়ের সঙ্গে আলাদা বাসায় ওঠার বিষয়টি তার পরিবার থেকে জানতেন না। হত্যাকাণ্ডের পর তারা এটি জেনেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এর আগেও নিমাই রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) কর্মরত থাকা অবস্থায় এক কলেজছাত্রীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে তার নগ্ন ভিডিও ধারণ করেছিলেন। ঐ ভিডিওটি স্থানীয় একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে ছড়িয়ে পড়ে। তখন তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। পরে নানা কৌশলে চাকরি ফিরে পেয়ে রেল পুলিশে যোগ দেন নিমাই।