অনেকেই বলিয়া থাকেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি এখন আর কোনো স্বপ্ন নহে। কেহ কেহ আরো খানিকটা অগ্রসর হইয়া বলেন—উন্নয়নের সকল সোপান এখন এক এক করিয়া বাস্তবায়িত হইতেছে। উন্নয়ন দেখিতে এবং উন্নয়নের কথা শুনিতে আমাদের ভালো না লাগিবার কোনো কারণ নাই। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বত্সর পার করিয়াছে। সুতরাং এখন আর বয়ঃসন্ধিকালের মতো ভুল করিবার বয়সও নাই। এতগুলি বত্সর পার করিয়া পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশই কমবেশি উন্নয়ন করিবে—ইহাই স্বাভাবিক।
বড় হইতে হইলে তো বড় স্বপ্ন দেখিতেই হইবে, তবে তাহা যেন সাত আসমান হইতে তারা পাড়িয়া আনিবার মতো না হয়। স্বপ্ন আসলে কী, সেই বিষয়ে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম বলিয়াছিলেন—‘মানুষ ঘুমাইয়া যাহা দেখে তাহা স্বপ্ন নহে। স্বপ্ন হইল তাহাই যাহা মানুষকে ঘুমাইতে দেয় না।’ আমরা ইতিপূর্বে অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখিয়াছি, ভাবিয়াছি। যেমন—গভীরতা কম থাকায় বড় বড় জাহাজ বাংলাদেশের কোনো বন্দরে নোঙর করিতে না পারিয়া সিঙ্গাপুর বন্দরে অবস্থান করে। সেইখান হইতে ছোট জাহাজে বা লাইটারেজে করিয়া দেশের বন্দরে আনিতে হয় পণ্য। ফলে বিপুল অঙ্কের চার্জ পরিশোধ করিতে হয় সিঙ্গাপুর বন্দরকে এবং লাইটারেজ বাবদ। ফলে আমদানি-রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের নির্ভর করিতে হয় বিদেশি বন্দর ও লাইটারেজের উপর। সুতরাং পায়রা বন্দর পরিপূর্ণরূপে চালু হইলে এই ব্যয় অনেকাংশেই কমিয়া আসিবে। কিন্তু সম্প্রতি পত্রিকান্তরে জানা গিয়াছে, পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা হইতে সরিয়া আসিয়াছে সরকার। অথচ ২০১৩ সালের নভেম্বরে সংসদে পায়রা সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষ আইন পাশ করিয়াছিল। এই আইনের আওতায় রাবনাবাদ নদী ও তত্সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের মোহনায় পায়রা সমুদ্রবন্দরের কাজও শুরু হয়। অথচ কাজ শুরুর এত বত্সর পরে আসিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল হইতেছে!
বাংলাদেশ কেন এত বত্সর পর এই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা ত্যাগ করিল—তাহার নেপথ্য কারণসমূহ জানিয়া কেবল এই কথাটাই মনে হইতে পারে—এই ব্যাপারে বাংলাদেশ সম্ভবত ঘুমাইয়া ঘুমাইয়াই স্বপ্ন দেখিয়াছিল। জানা গিয়াছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গভীর সমুদ্রবন্দরগুলিতে কমপক্ষে ১৮ মিটার ড্রাফটের জাহাজ নোঙর করে। ২০২৫ সাল নাগাদ ২৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজই প্রাধান্য পাইবে অনেক বন্দরে। এই অঞ্চলের সবচাইতে গভীর সমুদ্রবন্দর সিঙ্গাপুরের গভীরতা ২৪ দশমিক ৫ মিটার, যাহার ধারেকাছেও নাই পায়রা। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, পায়রা বন্দরের ১৪ মিটার গভীরতা চাহিলে পুরা চ্যানেলটিতেই এই পরিমাণ গভীরতা লাগিবে। কিন্তু পায়রা বন্দরে যাইতে যেই পথটি ব্যবহার করা হইবে সেই ‘অ্যাপ্রোচ ওয়ে’ কমপক্ষে ৬০ কিলোমিটার। এবং এই পুরা পথটির গভীরতা খুবই কম। এখন বলা হইতেছে, পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দরের সিদ্ধান্তটি ছিল একটা ‘জবরদস্তি’। এমনকি ইহা নাকি গভীর সমুদ্রবন্দরও হইত না! কারণ গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য ন্যূনতম ১৮ মিটার গভীরতা এই বন্দরে কখনোই রাখা যাইবে না। এমনকি ১৪ মিটার গভীরতাও রাখা যাইবে না। কারণ ইহা করিতে হইলেও যেই ধরনের খনন করিবার প্রয়োজন হইবে—তাহা অত্যধিক ব্যয়বহুল। অথচ বন্দরের জন্য বেলজিয়ামের একটা কোম্পানির সহিত ইতিমধ্যে রিজার্ভ হইতে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ধার করিয়া ড্রেজিং চুক্তি হইয়াছে! ইহা কি যৌক্তিক কাজ হইয়াছে?
এখন প্রশ্নটি পুনরায় করিতেই হয়—প্রকল্প শুরুর পূর্বে নিশ্চয়ই সমীক্ষা হইয়াছিল; সেইখানে কি এই সকল সমস্যা উঠিয়া আসে নাই? না। সমস্যাগুলি তখন বুঝা যায় নাই, কারণ সমীক্ষাই হয় নাই। আমরা কেবল স্বপ্ন দেখিয়াছি একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করিতেই হইবে। আমরা শূন্যে ব্যাবিলনের উদ্যান তৈরি করিতে চাহিয়াছি; কিন্তু সমীক্ষা করিয়া দেখি নাই, উহা বাস্তবতা হইতে কত দূরে। কী আশ্চর্য! আমরা কাজ শুরুর পরে সমীক্ষা করিয়াছি! একটি মৃত মানুষের বিউটিফিকেশনের জন্য আমরা তাহার শরীরে অত্যন্ত ব্যয়বহুল অপারেশন করিয়াছি এবং পরে জানিতে পারিয়াছি—মানুষটি মৃত! ইহার কি কোনো মানে হয়?
