উচিত চীনের মডেল অনুসরণ করা

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২১, ২১:৫০

২০২০ সালের মার্চে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হয় এবং এই এক বছর ধরে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের তাণ্ডব চলছে। মধ্যখানে গত বছর ডিসেম্বর থেকে এর প্রকোপ কমতে থাকে এবং এ বছর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে চলে আসে। টিকাদান কার্যক্রম শুরু ও সংক্রমণের মাত্রা কমে আসার সুযোগে জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি পালনে চরম ঔদাসীন্য প্রতীয়মান হয়। এমতাবস্থায় মার্চের ২য় সপ্তাহ থেকে সংক্রমণ হঠাত্ করে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং রোগের মাত্রা ও ধরন পূর্বেও সব রেকর্ড ভেঙে ফেলে। এবং বর্তমানে রোগীর সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। এমতাবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ না নিলে সারা দেশের জন্যই তা হবে আত্মঘাতী। করোনা ভাইরাস নিজে বেঁচে থাকার জন্য ঘন ঘন তার রূপ পরিবর্তন এবং সক্ষমতা ও সংক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধি করে যা এই ভাইরাসের নিয়ন্ত্রণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতিপূর্বে সারা বিশ্বে এমন ভাইরাসজনিত মহামারি দেখা যায়নি, যা আক্রান্ত ব্যক্তি অসুস্থ হওয়ার আগেই ছড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে। ইনকিউবেশন পিরিয়ড এবং অসুস্থতা সম্পর্কে জানার পূর্বেই এক ব্যক্তি অন্যজনকে সংক্রমিত করে। এইরূপ লক্ষণবিহীন রোগের বিস্তার হলো এই ভাইরাসের নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। নতুনভাবে রূপ পরিবর্তন এবং ‘Vaccine induced escape mutation’ এর ফলে মহামারি নিয়ন্ত্রণে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতাও আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এবং যেহেতু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে দীর্ঘমেয়াদি রোগ-প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না এবং রোগীরা বারবার সংক্রমিত হচ্ছে, তাই তথাকথিত ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদুপরি নতুন নতুন বিধ্বংসী মিউটেশনের জন্য হার্ড ইমিউনিটি সম্ভবপর বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। যার ফলে ইউরোপের দেশগুলোতে করোনা মহামারির ৩য় ও ৪র্থ ঢেউ চরমভাবে আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। করোনা মহামারির প্রথম ঢেউ সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারলেও জনগণের অসচেতনতার কারণে দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণ চরম কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে করে যেমন ব্যাপক জীবনহানি ঘটছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি এবং সংকুচিত হয়ে আসছে বৈদেশিক বাণিজ্য। এমতাবস্থায় অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি এড়ানোর লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। সুতরাং কালবিলম্ব না করে বাংলাদেশের উচিত চীনের মডেল অনুসরণ করা।

১. বর্তমানের উচ্চমাত্রার ইনফেকটিভিটি হ্রাস করতে দেশব্যাপী সর্বত্র লকডাউন কমপক্ষে ছয় সপ্তাহ অব্যাহত রাখা।

২. ছয় সপ্তাহ পরে যেখানে প্রাদুর্ভাব বেশি হবে সেই শহরটি শনাক্ত করে সেখানে কমপক্ষে আরো ১২ সপ্তাহ লকডাউন চালিয়ে যাওয়া।

৩. সমস্ত জেলায় কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল চিহ্নিত করা এবং এই সমস্ত হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেনসহ অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে কোভিড রোগী চিকিত্সার জন্য শক্তিশালী বিকল্পব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং নন-কোভিড রোগীদের জন্য একাডেমিক হাসপাতালগুলো খুলে দিতে হবে।

৪. লকডাউনের মাধ্যমে যখন রোগীর সংখ্যা হ্রাস পাবে তখন কমিউনিটি সেন্টার বা অন্যান্য উপযোগী স্থাপনাগুলোকে আইসোলেশন কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখতে হবে। একই সঙ্গে কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় প্রচুরসংখ্যক দ্রুত পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

৫. বিদেশফেরত যে কোনো যাত্রীকে দুই সপ্তাহের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে বা কমপক্ষে যতদিন তারা নেগেটিভ হয়ে না ওঠে, এতে করে বিদেশ থেকে আগত নতুন নতুন মিউটেন্ট ভাইরাসের প্রবেশ ঠেকানো যাবে।

৬. অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশেই ভ্যাকসিন তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৭. ব্যাপকহারে করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণ পরীক্ষা চালুর নিমিত্তে দেশেই প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও সরঞ্জামাদি তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৮. যেহেতু করোনা ভাইরাস ঘন ঘন মিউটেশন করে তাই নিয়মিত এর সংক্রমিত ভ্যারিয়েন্ট পরীক্ষা করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

৯. উপসর্গযুক্ত বা উপসর্গহীন যে কোনো রোগীকে কমিউনিটি থেকে পৃথক করা উচিত যাতে কোভিড রোগী কমিউনিটিতে রোগ ছড়াতে না পারে।

১০. টিকাদান কার্যক্রম কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল থেকে সরিয়ে অন্যত্র নেওয়ার ব্যবস্থা করা। আমরা যদি এক বছরের জন্য সমন্বিত উপায়ে এই ব্যবস্থাগুলোর প্রয়োগ করতে পারি তবে তা আমাদের এই করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণ পেতে সহায়তা করবে।

n লেখক : অধ্যক্ষ, মুগদা মেডিকেল কলেজ