দেশ জুড়ে নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের পাশাপাশি ছেলেশিশুও যে ধর্ষণের (বলাত্কার) শিকার হয় এ কথা সবাই জানলেও তার নেই কোনো পরিসংখ্যান। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে ছেলেশিশু এবং মেয়েশিশু ধর্ষণের সংখ্যা প্রায় সমান। কিন্তু ছেলেশিশু ধর্ষণের বিষয়ে সমাজ অদ্ভুতভাবে নিরব। ধর্ষণ আইনের সংজ্ঞাটাই এমন যে ভুক্তভোগী মানেই নারী, এ কারণে বিচার হয় না ছেলেশিশু ধর্ষণের।
গতবছর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ঘটনায় রাঙ্গুনিয়ার আহমদিয়া আজিজুল উম্মুল মাদ্রাসার হোস্টেল সুপার মো. নাসির উদ্দিন স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, ‘প্রতিদিন রুটিন করে তিনি একটি করে ছেলেশিশুকে ধর্ষণ করতেন।’ ২০ অক্টোবর যখন আদালতে স্বীকারোক্তি দিচ্ছিলেন ঐ মাদ্রাসা শিক্ষক, তখন রংপুরে মিঠাপুকুরে চার বছরের ছেলেশিশুকে ধর্ষণের সময় গ্রামবাসী আটক করে বাদশা মিয়া নামের ৫৫ বছরের এক ব্যক্তিকে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেবে গত বছর প্রথম আট মাসে ২০টি ছেলেশিশু ধর্ষণের মধ্যে মামলা হয়েছিল মাত্র ১১টির। ঢাকা ও সাতক্ষীরার ৯টি স্কুলের ১ হাজার ২০০ ছেলেশিশুর মধ্যে গবেষণা চালায় একটি বেসরকারি সংস্থা। তাদের জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন ছেলেশিশুর মধ্যে একজন ছেলেশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসায় নজরদারি না থাকার কারণে সেখানে একদিকে যেমন ছাত্রছাত্রীদের ওপর যৌন নির্যাতনসহ অন্য নির্যাতন বৃদ্ধি পাচ্ছে, অপরদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে না থাকার কারণে কওমি মাদ্রাসায় ঠিক কী হচ্ছে এবং কীভাবে এখানে নিপীড়ন বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব, তা-ও জানা যাচ্ছে না। কওমি মাদ্রাসাসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নসহ অন্যান্য নির্যাতনের কথা এত দিন ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এখন সেসব ঘটনা ক্রমশ সবার সামনে চলে আসছে। তারা আরো বলছেন, ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতনে সামাজিক আন্দোলন ও শাস্তির জায়গাটা শক্ত করতে হবে। কোনো স্কুল বা মাদ্রাসায় এ ধরনের ঘটনা ঘটলে ঐ মাদ্রাসা বা স্কুলের ওপর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
আইন অনুযায়ী, ১৬ বছরের কম বয়সি ছেলে বা মেয়েশিশুর ধর্ষণের বিচার একই আইনে হওয়ার কথা। কিন্তু সে আইনে আবার ধর্ষণের সংজ্ঞাটাই এমন যে ধর্ষণের শিকার মানেই নারী। সেই সঙ্গে বিচারের সময়ও ছেলেশিশু ধর্ষণের বিচারকে হালকাভাবে দেখা হয় বা দুর্বল ধারায় তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে বিচার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশনা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. রিয়াদ চৌধুরী বলেন, বেশির ভাগ ছেলেশিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে কওমি মাদ্রাসায়। যে সব মাদ্রাসায় আবাসিক ব্যবস্থা আছে। অন্য জায়গাতেও হচ্ছে। আলিয়া মাদ্রাসায় খুবই কম হয়। ছেলেশিশু নির্যাতনের বিষয়টি আইনে স্পষ্ট হওয়া যেমন দরকার, তার চেয়ে আইনের প্রয়োগ বেশি প্রয়োজন। তিনি বলেন, সচেতনতা বাড়াতে হবে শিক্ষা, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বইয়ে পরিবর্তন আনতে হবে। রাজনৈতিক ইন্টারফেয়ার থাকা যাবে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কমিটি করে দিতে হবে।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সহযোগী অধ্যাপক কামাল উদ্দিন বলেন, কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানায় নির্যাতন বেশি হচ্ছে। কওমি ধারার আবাসিক মাদ্রাসায় থেকে লেখাপড়া করতে হয়। এখানে যেসব শিক্ষার্থীরা আসে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা নিম্নমানের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা বলেন, শুধু মাদ্রাসাতেই নয়, ২০২০ সালে ৭০০ ক্যাথলিক ধর্মগুরু এবং থাইল্যান্ডে মংদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এসেছে। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষেরই উচিত হবে এখন তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের জবাব দেওয়া। নয়তো তাদের প্রতি মানুষের ধারণার পরিবর্তন ঘটবে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির বিষয়টি জবাবদিহির সংস্কৃতির আওতায় আনতে হবে। বাবা-মা বিশ্বাস করে তাদের শিশুকে শিক্ষাঙ্গনে পাঠান, সেখানে যদি এইভাবে নিপীড়নের শিকার হয়, তা খুবই উদ্বেগের বিষয়।
