আনন্দ পট

হাবল টেলিস্কোপ

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২১, ২০:১৫

সুদীপ্ত রিজওয়ান

জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহ থাকুক বা না থাকুক, মহাকাশের বিচিত্র, অনবদ্য এবং চিত্তাকর্ষক ছবি দেখে মুগ্ধ হয় না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। মহাকাশের বিচিত্র এবং বিস্ময়কর ছবিগুলো তোলার পিছনে যে যন্ত্রটির অবদান সবচাইতে বেশি সেটি হলো হাবল টেলিস্কোপ। এটি মহাকাশে স্থাপিত একটি দূরবীক্ষণ যন্ত্র। হাবল টেলিস্কোপ উদ্ভাবনের ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন বিজ্ঞানী গ্যালিলিও। ১৬১০ সালের দিকে তিনি সাইগ্লাসের সাহায্যে শনির বলয়ের চিত্র পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হন। আমাদের পৃথিবীকে ঘিরে যে বায়ুমণ্ডল রয়েছে সেটি মহাকাশ থেকে আসা আলোকে বাধা দেওয়ার কারণে সুস্পষ্ট ছবি তোলা সম্ভব ছিল না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য দরকার এমন একটি টেলিস্কোপ, যেটি ভূমিতে অবস্থিত টেলিস্কোপগুলোর সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারে। ১৯৪৬ সালে জ্যোতির্বিদ লাইম্যান স্পিটজার মহাকাশে এমন একটি টেলিস্কোপ স্থাপনের প্রস্তাব করেন।  কিন্তু তখন পর্যন্ত মহাকাশে কোনো রকেট পাঠানো সম্ভব হয়নি বলে এই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে স্পিটজার নাসাকে এই প্রস্তাব দিলে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি এবং নাসা যৌথভাবে ১৯৭৫ সালে স্পেস টেলিস্কোপ উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ করে। লকহিড মার্টিন এরোস্পেস কোম্পানির সহযোগিতায় দূরবীক্ষণটি বানাতে সময় লাগে প্রায় আট বছর। ১৯৮৩ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবলের নামানুসারে এর নাম রাখা হয় ‘হাবল স্পেস টেলিস্কোপ’। এডউইন হাবলকে বলা হয় আধুনিক কসমোলজির জনক। তিনি প্রমাণ করেছেন আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ মিল্কিওয়ে ছাড়াও মহাবিশ্বে অসংখ্য ছায়াপথের অস্তিত্ব রয়েছে। ১৯৯০ সালে হাবল টেলিস্কোপকে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হয়। তবে লেন্সের ত্রুটির কারণে প্রথম প্রচেষ্টাতে মহাকাশের নিখুঁত চিত্রধারণ করা সম্ভব হয়নি, ছবিগুলো হয়েছিল ঝাপসা। ১৯৯৩ সালে স্পেস শাটল সাতজনের একটি দলকে দূরবীক্ষণ যন্ত্রটির সমস্যা দূর করার জন্য মহাকাশযাত্রায় পাঠায় যারা টেলিস্কোপটিতে ওয়াইল্ড ফিল্ড প্ল্যানেটরি-২সহ আরো দুটি নতুন ক্যামেরা স্থাপন করে। ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে হাবল টেলিস্কোপ থেকে নতুন ছবি তোলা হয়, যেগুলো ছিল অত্যন্ত নিখুঁত ও চমকপ্রদ।

হাবল টেলিস্কোপ ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত টেলিস্কোপের চেয়ে ৫০গুণ বেশি শক্তিশালী এবং ১০গুণ বেশি রেজ্যুলুশনে ছবি তুলতে পারে। টেলিস্কোপটি দৈর্ঘ্যে প্রায় একটি স্কুল-বাসের মতো এবং ওজনে প্রায় দুটি হাতির সমান। এটি প্রতি ৯৭ মিনিটে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করে। টেলিস্কোপটিতে রয়েছে প্রাইমারি মিরর, সেকেন্ডারি মিরর, কারেক্টিভ অপটিকস এবং সায়েন্টিফিক ইন্সট্রুমেন্টস ফাংশনে ওয়াইড ফিল্ড প্ল্যানেটারি ক্যামেরা-২, নিয়ার ইনফ্রারেড ক্যামেরা অ্যান্ড মাল্টি অবজেক্ট স্পেকট্রোমিটার, স্পেস টেলিস্কোপ ইমেজিং স্পেকট্রোগ্রাফ, অ্যাডভান্স ক্যামেরা ফর সার্ভস ও ফাইন গাইডেন্স সেন্সর অপরদিকে মহাকাশযান হিসেবে এতে রয়েছে বিদ্যুত্ উত্পাদন করার অংশ, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা। হাবল টেলিস্কোপের সাহায্যে আমরা জানতে পেরেছি আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আরো দ্রুত গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। হাবলের কল্যাণেই জানা গেছে যে মহাকাশের বয়স ১,২০০ থেকে ১,৩০০ কোটি বছর। নক্ষত্রের জন্ম ও বিকাশ সম্পর্কেও নতুন তথ্য দিয়েছে হাবল টেলিস্কোপ। প্রতিনিয়ত মহাবিশ্ব এবং সৌরজগতের বিভিন্ন চমকপ্রদ এবং বিস্ময়কর তথ্য দিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে চলেছে হাবল টেলিস্কোপ।