এই তো কয়েকদিন হলো দেশের অন্যতম সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও ক্ষমতার রাজনীতির কুশীলব ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ চলে গেলেন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন দল ও সরকারের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সামরিক শাসকদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন ও দল গঠনে তার ভূমিকার জন্য আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছেন। তিনি নিজে তার ঐ ভূমিকাকে দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও জনগণের অধিকারকে যথাশীঘ্র ফিরিয়ে দিতে জনগণের পক্ষেই কাজ করেছেন বলে দাবি করতেন। ব্যক্তিগতভাবে সদা হাস্যমুখ, ভদ্র ও মার্জিত মানুষ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন সর্বমহলে।
লন্ডনে আইন পড়া শেষ করে ১৯৬৬ সালে দেশে ফিরে সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করেছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আইনজীবী ছিলেন। একাত্তরে বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়া খানের গোলটেবিল বৈঠকেও সঙ্গে ছিলেন তিনি। মুজিবনগর সরকারের দায়িত্বও পালন করেছেন। তার পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা করে আমরাও ছাত্ররাজনীতির মাঠ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের টেন্ট গরম করেছি।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই হাইকোর্টে ওনাকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। আমার সিনিয়র ব্যারিস্টার কে এস নবী, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও মওদুদ সাহেবরা ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মওদুদ সাহেব ও নবী সাহেব দুজনেই ছিলেন প্রয়াত ব্যারিস্টার রফিকুল হকের খুব প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ শিষ্য। বিভিন্ন সাংবিধানিক মামলায় সাহায্য নিতে দুজনই ব্যারিস্টার রফিকুল হকের কাছে ছুটে যেতেন। অনেক মামলার সাইটেশন বা নজির রফিকুল হক স্যারের ছিল মুখস্থ। এ বিষয়ে বিএনপি সরকারের আমলে সংসদ বর্জন ও সংসদ পদত্যাগসংক্রান্ত রিট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মওদুদ আহমদ ছিলেন জাতীয় পার্টির এরশাদ সাহেবের আইনজীবী আর আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক হিসেবে ব্যারিস্টার নবী সাহেব ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে। মওদুদ সাহেব প্রায়ই ঐ মামলা সংক্রান্ত মিটিংয়ে বলতেন, ‘নবী তুমি কোনো চিন্তা কোরো না, এবার তোমার নেত্রীকেই ক্ষমতায় আনব। আইনমন্ত্রী হবে তুমি। তখন তোমার নেত্রীকে আমার কথা বলতে ভুলবে না কিন্তু।’ বলে উভয়েই হা-হা করে হাসতেন। ঘটনাক্রমে নবী সাহেব মন্ত্রী না হলেও অ্যাটর্নি জেনারেল হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে নব্বইয়ের দশকের শেষদিকেই মওদুদ সাহেব আবারও বিএনপিতে যোগ দিয়ে ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী হয়েছিলেন। সংসদ বর্জন ও পদত্যাগ রিট মামলা চলাকালে হঠাত্ নবী সাহেব লন্ডনে গিয়েছিলেন বিশেষ প্রয়োজনে। তিনি টেলিফোনে মওদুদ সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করে মূল পিটিশন সংশোধনের একটি সাপ্লিমেন্টারি করতে বললেন। আমি ও বুদুভাই হাইকোর্টের ‘অ্যাভিডেভিট কমিশন’ নিয়ে গেলাম, ২৯ মিন্টু রোডের বিরোধীদলীয় নেত্রীর বাসভবনে, নেত্রীর স্বাক্ষরের জন্য। দোতলার ড্রয়িংরুমে আমু ভাই, তোফায়েল আহমেদ ও জলিল ভাইসহ আরো অনেকেই ছিলেন।
নবী সাহেব ও মওদুদ সাহেবের কথোপকথনে প্রায়ই তিনি বলতেন নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনে উদ্ভূত পরিস্থিতি হতে উত্তরণের উপায় হিসেবে তিন জোটের রূপরেখামতো পদত্যাগে জেনারেল এরশাদকে তিনি পরামর্শ দিয়ে উত্সাহিত করেছিলেন এবং নিজে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। ঐ শূন্যপদেই তিন জোট মনোনীত প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন সাহেবকে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিয়ে তার কাছেই ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ। এভাবেই সরকারবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্র তৈরিতে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন।
পরবর্তীকালে বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী থাকাকালে আইনজীবীদের বার নির্বাচনে ‘এক সদস্যের এক ভোট’ নীতির প্রবর্তন করে আইনজীবীদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। পূর্বে একজন আইনজীবী একাধিক বারে মেম্বার হয়ে সব বারেই ভোট দিতে পারতেন। এতে করে বার নির্বাচনে টাকাপয়সার ভূমিকা একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিগত ওয়ান-ইলেভেনের (সামরিক সহায়ক) সরকারের সময় তিনিও আপসহীন অন্য জাতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জেল খেটেছিলেন। তিনি রাজনৈতিক, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ওপর বিভিন্ন বই রচনা করে সমাদৃত হয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ে তার গবেষণালব্ধ লেখা বইগুলোর জন্যই তিনি ইতিহাসে বেঁচে থাকবেন। তার বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ‘বাংলাদেশ—কনস্টিটিউশনাল কোয়েস্ট ফর অটোনমি ১৯৫০-১৯৭১’, ‘এরা অব শেখ মুজিব’ (শেখ মুজিবের শাসনকাল), ‘ডেমোক্রেসি অ্যান্ড দ্য চ্যালেঞ্জ অব ডেভেলপমেন্ট’, ‘বাংলাদেশ—এ স্টাডি অব ডেমোক্রেটিক রেজিম’, ‘বাংলাদেশ—ইমারজেন্সি অ্যান্ড আফটারম্যাথ’ ইত্যাদি। বাংলাদেশের রাজনীতির ভাবদর্শন, গতি, প্রকৃতি, বাস্তবতাকে পরিপূর্ণভাবে বুঝতে অবশ্যই এ বইগুলো সহায়ক হবে।
তিনি পেশায় ছিলেন শতভাগ প্রফেশনাল। বারের নির্বাচন বা অন্য যে কোনো আচার-অনুষ্ঠানে রাজনীতির বাইরে বা ভেতরে কোনো রকম সংকীর্ণ গ্রুপিং বা কাউকে কোণঠাসা করে রাখার কোনো প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে দেখা যায়নি। আজকাল একই দলের নেতৃবৃন্দের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই দেখা যায়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জননেতা ওবায়দুল কাদের ভাই ও তিনি একই এলাকার নেতা। দুই দলের দুই বড় নেতা হলেও তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল সব সময়ই সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন। তিনি রাজনৈতিক সহাবস্থানে বিশ্বাসী ছিলেন এবং এটি তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
n লেখক :বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক আইনজীবী, ওয়াশিংটন আইন পেশায় কমর্রত
