আসিতেছে লম্বা শীতের দিন

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২১, ২২:০৮

বিশ্বে মহামন্দা নূতন কিছু নহে; কিন্তু ২০২০ সালে আসিয়া বিশ্ব যেই মহামন্দার ফাঁদে পড়িয়াছে, তাহা কেবল অপ্রত্যাশিতই নহে, অভূতপূর্বও বটে। একটি ভাইরাস যেই বিশ্ব অর্থনীতিকে নানান তরঙ্গে কোয়ারেন্টাইনে লইয়া যাইতে পারে, তাহা ২০২১ আসিয়া নূতন করিয়া শিখিতে হইতেছে। আমরা ভাবিতে শুরু করিয়াছিলাম, করোনার সংকট কাটাইয়া আবার বুঝি সকল কিছু স্বাভাবিক হইয়া যাইতেছে! করোনার প্রথম ঢেউয়ের ক্ষতি কত বত্সরে সামাল দেওয়া যাইবে, তাহারও হিসাব শুরু করা হইতেছিল; কিন্তু কথায় আছে—ম্যান প্রোপসেস বাট গড ডিসপোসেস। বিধাতা মানুষের ভাগ্যকে গোপন করিয়া রাখেন যবনিকার আড়ালে। সুতরাং আমরা যখন সুদিনের স্নিগ্ধ বাতাস পাইতেছিলাম, তখনই দেশে-বিদেশে করোনা পরিস্থিতির আবার অবনতি ঘটিল। এই অবনতির অভিঘাত কত তীব্র হইবে—কেহ বলিতে পারিতেছে না; কিন্তু প্রথম ঢেউয়ের ক্ষতির হিসাব আমাদের নিকট আছে। ২০২০ সালে করোনার জন্য বৈশ্বিক অর্থনীতি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হইয়াছে। তুলনা করিয়া বলা যায়, ১৯২৯ এবং ২০০৯ সালের মহামন্দার চাইতেও গত বত্সর করোনায় বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকোচন হইয়াছে অনেক বেশি। গত বত্সর বিশ্বের সবচাইতে বৃহত্ অর্থনীতির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সংকুচিত হইয়াছে প্রায় ৪ শতাংশ। জাপানের অর্থনীতি সংকুচিত হইয়াছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশসমূহে সংকোচন হইয়াছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাত্ বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্বদানকারী দেশসমূহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এতটাই মাইনাসের দিকে গিয়াছে যে, এই ধাক্কা কাটাইয়া উঠিতে দশক পার হইয়া যাইতে পারে। এই মুহূর্তে দ্বিতীয় ঢেউ আরো তীব্র হইয়া প্রবাহিত হইতেছে—সুতরাং সার্বিক পরিস্থিতি কত দূর পর্যন্ত কতখানি খারাপ হইতে পারে—তাহা আমাদের চিন্তার বাহিরে।

অভূতপূর্ব এই সংকটের গভীরতা ও তীব্রতায় তৃতীয় বিশ্বের ছোট অর্থনীতির দেশসমূহকে সম্ভবত বিধাতাকে নিজের হাতে বাঁচাইতে হইবে। করোনার অভিঘাতে বিশ্বের প্রায় ২৭০ কোটি শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা বিপন্ন হইয়াছে। স্পষ্ট করিয়া বলিলে, বিশ্বের মোট শ্রমজীবী মানুষের প্রায় ৮১ শতাংশই খুব খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়া দিনাতিপাত করিতেছে। বাংলাদেশের অবস্থাও তথৈবচ। বিবিএসের শিল্প ও শ্রম শাখার এক কর্মকর্তা জানাইয়াছেন, বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় টিকিতে না পারিয়া ব্যবসা সংকুচিত করিয়াছে। শ্রমিক ছাঁটাই করিয়াছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধই হইয়া গিয়াছে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, কোভিড সংকটে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে উত্পাদিত পণ্যের চাহিদা কমিয়া যাইবার কারণে বিগত এক বত্সরে মোট ৬৩০টি কারখানা বন্ধ হইয়া গিয়াছে। স্বাভাবিকভাবেই কমিয়া গিয়াছে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও। নূতন নূতন কারখানা স্থাপিত না হওয়ায় শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণও কমিয়া গিয়াছে। এলসি খোলার হারও কমিয়া গিয়াছে বিধায় সরকারের রাজস্ব আদায়েও চাপ পড়িতেছে।

অথচ আমাদের সম্ভাবনার দিকটি ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী, করোনার পূর্বে দেশে ৪৬ হাজার ২৯১টি কারখানা ছিল। ছয় বত্সরে কারখানার সংখ্যা বাড়িয়াছিল ৩ হাজার ৪৯৯টি। কেবল তাহাই নহে, গত দুই দশকে শিল্প খাতের বার্ষিক উত্পাদনের পরিমাণ বাড়িয়াছিল প্রায় ৯ গুণ। মনে রাখিতে হইবে, সমীক্ষা অনুযায়ী গড়ে ৫৯ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে পরিচালিত হইতেছে। এমনকি অতিক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যেও ৪৪ শতাংশ ঋণের মাধ্যমে চলিতেছে। এখন এই অভূতপূর্ব সংকটকালে ইহারা কী করিয়া টিকিয়া থাকিবে? আমাদের জিডিপিতে যত মূল্য সংযোজন হয়, ইহার প্রায় ২৪ শতাংশই আসে শিল্প উত্পাদন খাত হইতে। সুতরাং শিল্পকারখানার সারিবদ্ধ ইট পড়িতে শুরু করিলে উহা রাজস্বের অনেকগুলি ইটকেও ফেলিয়া দিবে। ক্রেতা-ভোক্তার হাতে টাকা না থাকিলে চাহিদা এবং উত্পাদনও হ্রাস পাইতে বাধ্য। এমতাবস্থায়, সংকটময় অর্থনীতিতে ‘অক্সিজেন’ জোগান দিতে ক্রেতা-ভোক্তা ও উত্পাদক—সকলের হাতেই টাকার প্রবাহ বৃদ্ধির বিকল্প নাই। বিশেষজ্ঞরা উচ্চারণ করিতেছেন সাবধানতার বাণী—আসিতেছে ভয়ংকর শীতল যুগ, এখনই ইহার জন্য লম্বা প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেই হইবে।