বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে বিপর্যস্ত হইয়া পড়িয়াছে সমগ্র দেশ। প্রতিদিনই নূতন রোগীর সংখ্যা যেমন রেকর্ডসংখ্যক আকারে বাড়িতেছে, তেমনই বাড়িয়া চলিয়াছে মৃত্যুর সংখ্যাও। তীব্র হারে সংক্রমণ বাড়িয়া যাওয়ায় দেশব্যাপী জারি করা হইয়াছে লকডাউন। করোনা সংক্রমণের এই সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হইয়া দাঁড়াইয়াছে ডায়রিয়া আতঙ্ক। ইতিমধ্যে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ডায়রিয়া পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করিয়াছে। বিভিন্ন পত্রিকার রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে দক্ষিণাঞ্চলের বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, গোপালগঞ্জ প্রভৃতি জেলাসমূহে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়িয়া গিয়াছে। করোনার সংক্রমণের মধ্যেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক রোগীকে চিকিত্সা দিতে বেগ পাইতে হইতেছে চিকিত্সায় সংশ্লিষ্ট সকলকে। জেলা সদর হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীতে ভরিয়া গিয়াছে, ইতিমধ্যে বেশ কয়েক জনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গিয়াছে। বিপুল পরিমাণ রোগীর কারণে তীব্রভাবে দেখা দিয়াছে ঔষধ সংকট। ডায়রিয়ার কারণে মানবদেহে যে পানিশূন্যতা দেখা দেয়, তাহা পূরণ করিতে প্রয়োজনমতো স্যালাইন দিতে হয়। ইতিমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক হাসপাতালে ঔষধ সংকটের পাশপাশি স্যালাইনেরও তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় রোগীদের মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাইতে হইতেছে। বিগত এক যুগ কিংবা তাহারও বেশি সময়ের মধ্যে ডায়রিয়ার সবচাইতে মারাত্মক প্রকোপে দিশাহারা হইয়া পড়িয়াছে দেশের দক্ষিণাঞ্চল।
দেশের ডায়রিয়া ও কলেরা রোগের চিকিত্সায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ বাংলাদেশ বা সংক্ষেপে আইসিডিডিআরবি দীর্ঘদিন ধরিয়া কাজ করিয়া যাইতেছে। ডায়রিয়া, কলেরা রোগসমূহের চিকিত্সা এবং গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারও বিভিন্ন সময়ে প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। একসময় দেশে ডায়রিয়া মহামারি আকারে ছড়াইয়া পড়িত এবং বহু মানুষ প্রাণ হারাইত। বর্তমানে ডায়রিয়া রোগের সেই মারাত্মক প্রকোপ কমিয়া আসিলেও সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক মহামারি করোনা সংক্রমণের মধ্যে নূতন করিয়া বিপুলসংখ্যক রোগীর আক্রান্ত হইবার বিষয়টি চিন্তার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। সাধারণত কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট বাড়িলে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়িয়া যাইবার আশঙ্কা থাকে। তীব্র গরমের কারণেও অনেক সময় ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়িয়া যায়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সম্প্রতি বাড়িয়া যাওয়া ডায়রিয়া প্রকোপের পিছনে যে বিষয়টিকে প্রধান কারণ হিসাবে বিবেচনা করা হইতেছে, তাহা হইল অনাবৃষ্টির কারণে স্বাভাবিক পানির প্রবাহ কমিয়া আসায় পানিদূষণ বৃদ্ধি পাওয়া। বৈরী আবহাওয়া, দূষিত ও লবণণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হইয়া ইতিমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ৫ হাজারের অধিক রোগী হাসপাতালস্থ হইয়াছে। করোনা সংক্রমণের কারণে ইতিমধ্যেই দেশের হাসপাতালগুলিতে রোগীদের চাপ সামলাইতে চিকিত্সক ও কর্মীদের দিশেহারা অবস্থা, ইহার মধ্যে ডায়রিয়া রোগীদের চিকিত্সাসেবা প্রদানে তাহাদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হইতেছে। তাহার উপর অনেক ডায়রিয়া রোগীর করোনার টেস্ট ছাড়াই চিকিত্সা প্রদান করিতে গিয়া ঝুঁকির মুখে পড়িতে হইতেছে চিকিত্সা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে। করোনার প্রকোপে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেহাল দশা এমনিতেই দুশ্চিন্তার বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছিল, ডায়রিয়ার এমন আকস্মিক প্রাদুর্ভাব সেই দুশ্চিন্তাকে আরো বেগবান করিয়াছে। করোনা মহামারির মধ্যে হঠাত্ করিয়া ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়িয়া যাওয়ায় মহামারির সঙ্গে ইহার কোনো সম্পর্ক রহিয়াছে কি না, তাহাও খতাইয়া দেখা প্রয়োজন। ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত ঔষধ ও স্যালাইন সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করিতে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হইবে। যেই সমস্ত এলাকায় ডায়রিয়া ব্যাপক হারে ছড়াইয়া পড়িয়াছে, সেইখানকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিরও বিশেষ দায়িত্ব রহিয়াছে। কালক্ষেপণ না করিয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির উচিত তাহাদের প্রয়োজনীয় খাবার স্যালাইন ও ঔষধের তালিকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠাইয়া দেওয়া। করোনা রোগীদের চিকিত্সার কারণে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীসহ অন্যান্য রোগীর চিকিত্সাসেবা যাহাতে ব্যাহত না হয়, সেই দিকেও খেয়াল রাখিতে হইবে কর্তৃপক্ষকে। সংকট আরো ঘনীভূত হইবার আগেই সকলকে সতর্ক হইতে হইবে।
